ধর্ম ও পুজোপাঠ শহর

বৃষ্টির মধ্যেই পুরুলিয়ায় বিষহরি আরাধনার প্রস্তুতি, হাসি নেই মৃৎশিল্পীদের মুখে

একদিকে আবহাওয়া ও আর্থিক অনটনের কারণে নাজেহাল মৃৎশিল্পীদের হাহাকার। অন্যদিকে পূজোর প্রধান উপকরণ হাঁসের বাজারে আগুন দর। এই দুই নিয়েই এবারে জেলার মনসা পূজোর আবহ।
বৃষ্টির মধ্যেই পুরুলিয়ায়  বিষহরি আরাধনার প্রস্তুতি, হাসি নেই মৃৎশিল্পীদের মুখে

 

 

 

সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:

ঐতিহ্যবাহী মনসা পূজো পুরুলিয়ার কোনায় কোনায় আরাধনার প্রস্তুতি চললেও এই উৎসব ঘিরে সামনে আসছে দুই বৈপরীত্যময় ছবি। একদিকে আবহাওয়া ও আর্থিক অনটনের কারণে নাজেহাল মৃৎশিল্পীদের হাহাকার। অন্যদিকে পূজোর প্রধান উপকরণ হাঁসের বাজারে আগুন দর। এই দুই নিয়েই এবারে জেলার মনসা পূজোর আবহ। তবে এই উৎসবে সবচেয়ে বড় খুশির খবর পুরুলিয়া-বাঁকুড়ায় আজ মঙ্গলবার পুজোর দিন ছুটি।

মনসা পূজো মূলত সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের পূজো হিসেবে পরিচিত হলেও, বর্তমান বাজারদর ও আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রতিমা শিল্পীরা শিল্পী ফকির পাল‌ বলেন,
"ধোলক করুণাময়ী', আস্তিক মুনি ও লক্ষ্মীদেবীর সমন্বয়ে রচিত থিম কিংবা 'রাজকন্যে' ছাঁচের প্রতিমা নিয়ে আশা থাকলেও বাজারে খদ্দেরের দেখা মিলছে না বললেই চলে। প্রতুলবাবুর কথায়, "মনসা পুজো মূলত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পুজো। এই অঞ্চলে সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষজনই  বেশি অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু এবার জেলায় সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় চাষবাস ভালো হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের হাতেও টাকা নেই, আর তার প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে আমাদের প্রতিমা বিক্রিতে।" তিনি আরও বলেন , মূর্তি তৈরির প্রধান মরশুমে টানা বৃষ্টির কারণে চরম বিপাকে তারা। ত্রিপল টাঙিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। যাতে কাজের মানও কিছুটা মার খাচ্ছে।তবে কষ্টের এখানেই শেষ নয়। মূর্তি গড়ার কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম শিল্পীদের কোমর ভেঙে দিয়েছে। সুতলি, দড়ি থেকে শুরু করে সুতির কাপড়, এমনকি কলকাতা থেকে আনা প্রতিমার নকল চুল ও মাটির দাম এক লাফে অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। ১৫০ টাকার সুতলির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫০ টাকা। কেজি প্রতি কাপড়ের দামও বেশি। কাঁচামালের এই লাগামহীন দামবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বাড়লেও পুরুলিয়ার স্থানীয় বাজার থেকে সেই অনুযায়ী প্রতিমার সঠিক দর পাচ্ছেন না শিল্পীরা।
সাধারণত ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকার ছোট মূর্তির পাশাপাশি ২,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা মূল্যের বড় মূর্তিও তৈরি হয়েছে কারখানায়। যদিও ফি বছর ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুর সহ 
অন্যান্য দূরদূরান্তের এলাকা থেকে বরাতের চাপ থাকে। এবার সেখানেও ভাটার টান। এই পুজোয় বাজেট কম থাকলেও, মনসা পূজোর অন্যতম প্রধান নৈবদ্য  
হাঁস কেনার ক্ষেত্রে কিন্তু উৎসাহে কমতি নেই। লোকবিশ্বাস ও রীতি অনুযায়ী, মা মনসার আরাধনায় হাঁস অপরিহার্য নৈবেদ্য। পূজো এবং তার পরবর্তী দিনে পুরুলিয়ার ঘরে ঘরে হাঁসের মাংস রান্নার বিশেষ প্রচলন রয়েছে। পুজোর চার থেকে পাঁচ দিন আগে থেকেই পুরুলিয়ার বিভিন্ন বাজারে হাঁসের চাহিদা আকাশছোঁয়া। বিপুল চাহিদার কারণে এই জেলায় মনসা পূজোর কয়েক মাস আগে থেকে
রীতিমতো হাঁস চাষ করা হয়।  হাঁসের দাম আকাশছোঁয়া হওয়া সত্ত্বেও এর বিক্রি কমেনি। মনসা পূজো উপলক্ষ্যে প্রতি বছরের মতো এবারও জেলা জুড়ে প্রচুর সংখ্যক হাঁস বিকিকিনি হচ্ছে।
বৃষ্টি, কাঁচামালের বাড়তি দর আর ক্রেতাহীনতার টানাপোড়েনের মাঝে দাঁড়িয়েও ঐতিহ্য রক্ষায় কাদামাটি ঘেঁটেই দিনরাত এক করছেন ফকির পালের মতো শিল্পীরা। 
কিন্তু উৎসব শেষে হাতে কতটা অর্থ থাকবে  
তার অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।