ব্লক আমার জন্মভূমি

ডাল চাষ করেই নদী বাঁধতে চেয়েছিলেন পুরুলিয়ার যে গ্রামের মানুষ

পুরুলিয়া ১নম্বর ব্লকের পটমপুটরা জনপদের মহিলাদের অবস্থা সুকুমার রায়ের 'অবাক জলপান'এর তৃষ্ণার্ত পথিকের মতোই।
ডাল চাষ করেই নদী বাঁধতে চেয়েছিলেন পুরুলিয়ার যে গ্রামের মানুষ

দেবীলাল মাহাতো :


ভোর থেকেই নদীর চরে মহিলাদের ভিড়। কোদাল , থালা দিয়ে দেড় থেকে দু’ফুট বালি সরালেই জমছে জল। প্রথমে ঘোলা হলেও কিছু ক্ষণ পরে পরিষ্কার জল বেরোয়। সেই জল কলসি, হাঁড়ি, বালতিতে ভরে  মাথায় ,হাতে করে  বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। এই ভাবেই কয়েক দশক ধরে নদীর বালি খুঁড়ে 'চুয়া' তৈরি করে পানীয় জল সংগ্রহ করছেন মহিলারা। পুরুলিয়া ১নম্বর ব্লকের  পটমপুটরা জনপদের মহিলাদের অবস্থা সুকুমার রায়ের 'অবাক জলপান'এর তৃষ্ণার্ত পথিকের মতোই।

গ্রামের রাস্তা।

ঝালদার  জাবড় পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে তিরতির করে বয়ে চলেছে কংসাবতী নদী। এক সময় নদীর দু’পাশে ছিল ঘন জঙ্গল। আর নদী ও জঙ্গলকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে জেলার এক একটি জনপদ। নদী থেকে জল সংগ্রহ আর জঙ্গল থেকে ফলমূল আহরণ করেই জীবনধারণ। তার মাঝেই জঙ্গল কেটে কয়েকশো বছর আগে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল সর্দার ও মাঝি সম্প্রদায়ের মানুষজন। পরবর্তীকালে বাহাদুর মাহাতো নামে এক মাহাতো সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস শুরু করেন । এইভাবেই এক সময় পটমপুটরা গ্রামের পত্তন হয় । গ্রামবাসীরা জানান, বাহাদুর মাহাতো যেখানে বসবাস শুরু করেছিল। পরে সেই এলাকা থেকে সরে এসে গ্রামের অন্যত্র বসবাস শুরু করে তার বংশধরেরা। ছেড়ে আসা এলাকা 'কুদরা থান 'নামে পরিচিত। 'কুদরা থানে'র বর্তমান লায়া অজিত মাহাতো বলেন - "বছরের নির্দিষ্ট সময়ে আচার অনুষ্ঠান মেনে পুজা অর্চনা করা হয়ে থাকে। তিনি আরও জানান, বাহাদুর মাহাতোর তিন স্ত্রী ছিল। তিন স্ত্রীর সাত পুত্র। সাত পুত্রের বংশধরেরাই বর্তমানে গ্রামে বসবাস করে থাকেন। বর্তমানে গ্রামের তিনটি পাড়ায় সর্দার (লায়া), মাঝি,মাহাত ছাড়াও মুসলিম,দে, সহিস সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ তফসিলি জনজাতি ভুক্ত। ২০১১ সালের জনগণনা অনুয়ায়ী, গ্রামের ভোটার সংখ্যা ১,১১০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫৮২ ও মহিলা ৫২৮ জন।

গ্রামের রাস্তা।

 

এক  সময় গ্রামের মানুষের জীবন ছিল খুবই কষ্টকর। তখন চাষের জমি ছিল না, ছিল না অন্য কোনও জীবিকার উপায়। গাছের পাতা, জঙ্গলের ফলমূল এবং নদী ও জোড়ের মাছ খেয়েই দিন কাটাতে হতো গ্রামবাসীদের। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আনন্দ লায়ার সেই কষ্টের স্মৃতি টাটকা। পরে জঙ্গল কেটে চাষের জমি তৈরি করেন। সেই জমি ডালশস্য চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় প্রচুর পরিমাণে ভুট্টা, বুট ও খেসারির চাষ হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে গ্রামের অর্থনীতির ভিতও মজবুত হয়। এই প্রসঙ্গে গ্রামে একটি লোককথা প্রচলিত গ্রামে রয়েছে। কথিত আছে, এক বার এক আলোচনা সভায় নিজেদের সমৃদ্ধি নিয়ে তর্ক শুরু হয়। সেই সভায় রাঙামাটি গ্রামের এক ব্যক্তি গর্ব করে বলেন, তিনি ধান দিয়ে কংসাবতী নদী বেঁধে দেবেন। ঘাঘরজুড়ি গ্রামের এক বাসিন্দা ঘোষণা করেন, তিনি খুচরো পয়সা দিয়ে নদী বাঁধবেন। তা শুনে, পটমপুটরা গ্রামের বাহাদুর মাহাতো সদর্পে ঘোষণা করেন, তিনি বিভিন্ন ডালশস্য দিয়েই কংসাবতী নদীকে বেঁধে দেবেন। সেই থেকেই এই গ্রামের ডালশস্য চাষের খ্যাতি লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে বলে দাবি প্রবীণদের। আগের থেকে বিভিন্ন কারনে বিভিন্ন ডালশস্য চাষের উৎপাদন কম হলেও, বেগুন চাষ করে গ্রামের মানুষের অর্থনীতি বেড়েছে।

গ্রামের পলাশবন ।

তবে গ্রামের নাম কেন পটমপুটরা হল, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই গ্রামবাসীদের। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, এই গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম। উর্বর মাটি, চারপাশে সবুজের সমারোহ এবং সহজে পানীয় জলের উৎস থাকায় বহু বছর আগে তাঁদের পূর্বপুরুষরা এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর অনুমান, পটে আঁকা ছবির মতো সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই গ্রামের নামকরণ পটমপুটরা হয়ে থাকতে পারে। নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের ইতিহাস।

গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পুরুলিয়া শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্রামটি জয়পুর ও পুরুলিয়া ১ নম্বর ব্লককে বিভাজন করেছে। পলাশ, খেজুর, বাবলা গাছে ঘেরা এই গ্রামের দু’দিকে কংসাবতী নদী ও এক পাশে বাঁকা জোড়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় একখণ্ড বিচ্ছিন্ন বদ্বীপ। গ্রামবাসীদের আক্ষেপ, গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ সুন্দর হলেও, স্বাধীনতার এত বছর পরেও যাতায়াতের দুর্ভোগ মেটেনি। রাস্তার জন্য বিস্তর ক্ষোভ রয়েছে গ্রামবাসীদের । স্বাধীনতার ৮০ বছর পেরিয়ে গেলেও গ্রামে ঢোকে না চার চাকার গাড়ি। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলে ডুলিই ভরসা। তাঁরা জানান গ্রামে ঢোকার মুখে রয়েছে বাঁকা জোড়। সেই জোড়ের উপর দু'দশকে দুটি সেতু তৈরি হলেও সংযোগকারী রাস্তার জন্য সেই সেতু ব্যবহার করতে পারেন না গ্রামবাসীরা।বাম আমলে রাস্তার জন্য ভোট বয়কট করেছিলেন গ্রামের বাসিন্দারা। তারপর কিছুটা রাস্তার সংস্কার করা হয় । গ্রামের বাসিন্দা চিত্ত মাহাতো ,স্বপন মাহাতো জানান, "বারবার প্রশাসনের কাছে সেতু ও রাস্তার দাবিতে দরবার করেছি। কিন্তু আজও গ্রামের মানুষ নিরাপদে যাতায়াতের রাস্তা পেল না।" গ্রামের কাছেই কংসাবতী নদীর উপর সেতুর কাজ দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

গ্রামের হরি মন্দির।

রাস্তার পাশাপাশি পানীয় জল নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে গ্রামের মানুষের। সারা বছর জলের সমস্যায় ভোগেন তারা। পর্যাপ্ত নলকূপ না থাকায় গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাদের নদী থেকে চুয়া খুঁড়ে জল সংগ্রহ করতে হয়। বর্ষাকালে সমস্যা আরও বাড়ে । তখন ঘোলা জলই পান করতে হয় বলে তাদের অভিযোগ। তাঁরা জানান, গ্রামের সন্নিকটেই রয়েছে সিন্দরি চাষমোড় জল প্রকল্পের পাম্প ও পাম্পহাউস। সেই প্রকল্প থেকে পাঁচটি গ্রামের মানুষ জল পেলেও বঞ্চিত রয়েছে পটমপুটরা গ্রাম। অভিযোগ, বারবার প্রকল্প থেকে গ্রামে জল সরবরাহের জন্য আবেদন করলেও , সমস্যা মেটেনি। অবস্থা , ঠিক যেন প্রদীপের নীচে অন্ধকার। গ্রামের মহিলারা জানান," কষ্ট হলেও কয়েকশো মিটার দূর থেকে রোজ নদী খুঁড়ে পানীয় জল আনতে যেতে হয় । সেই জলেই তৃষ্ণার্ত মেটানো থেকে রান্না , সব কাজেই চলে।

আগের থেকে গ্রামে অনেকটাই শিক্ষার হার বেড়েছে বলে জানান গ্রামের বাসিন্দা মানিক মাহাতো, অম্বরীশ মাহাতোরা। বর্তমানে গ্রামে রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি শিশু শিক্ষা কেন্দ্র, একটি মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র। রয়েছে দুটি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। একটি হরি মন্দির । সংস্কৃতি চর্চায় সুনাম রয়েছে গ্রামের। গ্রামে রয়েছে একটি ছৌনাচের দল, তিনটি করম নাচের দল, একটি হরিনাম সংকীর্তনের দল। কালিপুজা ও সহরায় পরবে মাটির ঘর গুলিকে রঙে আলপনায় সাজিয়ে তোলেন মাহাতো, মাঝি সহ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন। তখন গ্রামের সৌন্দর্য আরও বাড়ে।

▪️▪️▪️


চিত্তরঞ্জন মাহাতো
গ্রামের বাসিন্দা


আমার জন্ম এই গ্রামেই। পলাশ, খেজুর, বাবলা-সহ বিভিন্ন গাছগাছালিতে ভরপুর আমাদের গ্রামের সৌন্দর্য অসাধারণ। দু’দিকে কংসাবতী নদী, এক পাশে বাঁকা জোড়। সবুজে ঘেরা এই গ্রামকে দূর থেকে দেখলে একখণ্ড বিচ্ছিন্ন ব-দ্বীপের মতো মনে হয়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে আমাদের দীর্ঘ দিনের যন্ত্রণা। আমাদের যাতায়াতের দুর্ভোগ আজ চরমে। স্বাধীনতার ৮০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও গ্রামে চার চাকার গাড়ি ঢোকে না। রাস্তার অভাবে গ্রামে অ্যাম্বুল্যান্স আসতে পারে না। কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ডুলিতে করে তাঁকে কয়েকশো মিটার বয়ে নিয়ে গিয়ে তার পর হাসপাতালে পাঠাতে হয়।
গ্রামে ঢোকার মুখেই রয়েছে বাঁকা জোড়। সেই জোড়ের উপর গত দু’দশকে দু’টি সেতু তৈরি হয়েছে। কিন্তু সংযোগকারী রাস্তা না থাকায় সেই সেতু কোনও কাজেই লাগে না। অন্য দিকে, গ্রামের কাছেই কংসাবতী নদীর উপর সেতুর কাজ দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বাম আমল থেকে আজ পর্যন্ত বারবার প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছি।  কিন্তু আজও যাতায়াতের রাস্তা পেলাম না । প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই আবেদন, এই দুর্ভোগ কবে কাটবে? কবে আমরা একটু নিরাপদে যাতায়াতের রাস্তা পাব?

▪️▪️▪️


মানিক মাহাতো 
গ্রামের বাসিন্দা

আগে গ্রামে শিক্ষার হার ছিল খুবই কম। এখন সেই ছবিটা অনেকটাই বদলেছে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখন স্কুল-কলেজে যাচ্ছে। শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে অভিভাবকদের মধ্যেও। পাশাপাশি, গ্রামে সাংস্কৃতিক চর্চার প্রচলন আগে থেকেই রয়েছে। ছৌ, টুসু, ঝুমুর, করম-সহ বিভিন্ন লোকসংস্কৃতি নিয়ে চর্চা হয়। যে কোনও অনুষ্ঠানে ছোট থেকে বড়, সবাই অংশ নেন। ঢোল,মাদলের তালে সবাই মেতে ওঠে । এই ঐক্যই আমাদের গ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি। কালের প্রবাহে লোক সংস্কৃতিগুলি যখন হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই গ্রামের বহু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন সেগুলিকে ধরে রাখতে।যাতে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও নিজেদের সংস্কৃতি প্রবাহিত হয়, সেই চেষ্টাও চলছে। কারণ লোকসংস্কৃতি জীবনের কথা বলে, প্রাণের কথা বলে, মাটির কথা বলে।

▪️▪️▪️