শুভদীপ মাহাতো, পুরুলিয়া :
করম উৎসবকে কেন্দ্র করে গমগম করে উঠল জঙ্গলমহল পুরুলিয়ার কড়াডির মাঠ। লাখো মানুষের সমাগমে কড়াডির মাঠ যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
অনুষ্ঠানমঞ্চে তিনি যেমন কুড়মি সমাজের দীর্ঘদিনের দাবিদাওয়া নিয়ে একের পর এক বড় ঘোষণা করেন, তেমনই জঙ্গলমহল ও কুড়মি আন্দোলন নিয়ে রাজনীতি করা বিরোধীদের কড়া ভাষায় নিশানা করেন।
অনুষ্ঠানে পৌঁছে জঙ্গলমহলের ঐতিহ্যবাহী করম পরবের নাচ-গানে মুগ্ধ হন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঞ্চে উঠে তিনি স্থানীয় শিল্পীদের সাথে মাদৈল বাজিয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন। তার আগে করম ডাল পুঁতে প্রণাম করেন শুভেন্দু।
উপস্থিত জনসমুদ্রকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন,।"এক অদ্ভুত ও আনন্দের দৃশ্য! আকাশ থেকে দেখছিলাম, আমার দিদি এবং বোনেরা কী সুন্দর করম পরব উপলক্ষে তাদের নাচের দল নিয়ে এসেছেন। জঙ্গলমহলের লোকশিল্পীরা কী অপূর্ব ছন্দে ছন্দে বাদ্যযন্ত্রের বোল তুলছেন,আকাশ থেকে মনে হচ্ছিল চারিদিকে এক অপরূপ আনন্দ, চারিদিকে হলুদ আর হলুদ"।
তিনি আরও যোগ করেন, স্বাধীনতার পর কোনো মুখ্যমন্ত্রী এই প্রথমবার করম পরবে সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেন, যা তাঁর পরম প্রাপ্তি। এর জন্য তিনি মূল মানতা অজিত প্রসাদ মাহাতো, যুধিষ্ঠির মাহাতো, সুধাংশু মাহাতো, পরিমল মাহাতো এবং সঞ্চালক সঞ্জয় মাহাতো সহ সমস্ত আয়োজকদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
অনুষ্ঠানের সূচনাতেই কুড়মি নেতা অজিত প্রসাদ মাহাতো নাম না করে ঝাড়খণ্ডের ডুমরির বিধায়ক টাইগার জয়রাম মাহাতোকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু নেতা অপপ্রচার করছেন যে এই মিটিং নাকি বিজেপির অর্থানুকূল্যে বা অমিত শাহের টাকায় হচ্ছে।
এর জবাবে মঞ্চ থেকেই স্বাভিমানের সুর চড়িয়ে অজিত মাহাতো বলেন,
"যাঁরা বেইমানের মতো কথা বলে, তাঁদের না শুধরালে চলবে না। ছাগল বেচে, গরু বেচে, চাল-মুরগি-হাঁস বিক্রি করে নিজেদের টাকায় গাড়ি ভাড়া করে লোক এসেছে। আদিবাসী কুড়মি সমাজ আমরা যতদিন থেকে করছি, কারও টাকায় করিনি।"
তিনি পুরুলিয়ার বহুদিনের বন্ধ থাকা হোমিওপ্যাথিক কলেজ চালু করা সহ বেকার যুবকদের নানা সমস্যার কথা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন এবং আশাপ্রকাশ করেন যে নতুন মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের সমস্ত দাবি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবেন। মুখ্যমন্ত্রী আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁদের নবান্নে আসতে বলেন।
কড়াডির মাঠের সভা থেকে জঙ্গলমহলের সার্বিক উন্নয়ন এবং কুড়মি সমাজের জন্য একাধিক বড় সামাজিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, "বিগত তৃণমূল সরকার কুড়মি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডকে অকার্যকর করে রেখেছিল এবং মাত্র একবার ১০ কোটি টাকা দিয়েছিল। বর্তমান সরকার বাজেটে বোর্ডের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যা আগামী বছরের মার্চের মধ্যে খরচ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।"
জঙ্গলমহল ও পুরুলিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় বড় আশ্বাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "ভরসা রাখুন, কোনো পাহাড় কাটা হবে না। আমি জেলা শাসক এবং মিনারেল কর্পোরেশনকে নির্দেশ দিয়েছি কোনো পাহাড় আর নিলাম করা যাবে না।"
অজিত মাহাতোর অনুরোধে সাড়া দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভূমি দফতরে জমির রেকর্ড তোলার জন্য যে ১০ টাকা ফি দিতে হতো, নবান্নে আবেদন পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই প্রথা গোটা পশ্চিমবঙ্গ থেকে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পানীয জল, রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ পরিকাঠামো গঠনের জন্য 'পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতর' নিজের হাতে রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী এবং এই খাতে ১৬০০ কোটি টাকার কাজ করা হবে বলে ।
মঞ্চ থেকে বিগত তৃণমূল সরকারের নীতিকে ভয়ানক চক্রান্ত ও বিচ্ছিন্নতাবাদ বলে আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন," বিগত সরকার জঙ্গলমহলের মূলবাসীদের মধ্যে ভাইয়ে-ভাইয়ে ও বোনে-বোনে বিরোধ লাগিয়ে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্ত করেছিল"।
পাশাপাশি, ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে কুড়মি সমাজের উদ্বেগের নিরসন করে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, "বিধায়ক বিশ্বজিৎ মাহাতো, অজিত বাবু এবং সাংসদ জ্যোতির্ময় বাবু আমায় ফোন করে ইউসিসি থেকে ছাড়ের অনুরোধ করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে ইউসিসির আওতা থেকে আমরা কুড়মি সমাজকে বাইরে রেখেছি। আপনাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধিকার রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।"
মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আয়োজিত এই মাঠে লাখ লাখ মহিলা লোকশিল্পী একযোগে করম নাচে অংশ নিয়ে পুরো এলাকাকে উৎসবে মুখরিত করে তোলেন। ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও মাদলের তালে আদিবাসী ও লোকসংস্কৃতির এই জনসমাগম জঙ্গলমহলের সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঝাড়খণ্ডের প্রাক্তন উপ-মুখ্যমন্ত্রী সুদেশ মাহাতো সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার বার্তা দেন। তিনি বলেন, "নিজের জীবন ও কর্মকে উৎসর্গ করে, এই রাজ্যকে, নিজের সমাজকে এবং সমস্ত মানুষকে উৎসর্গ করে আমাদের এই চেষ্টাই থাকবে যে আমরা যে রাস্তায় এগিয়ে চলছি, এতে আমাদের সমাজের পাশাপাশি রাজ্য ও দেশের বিকাশও যেন নিহিত থাকে।" তিনি আরও জানান যে, সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে তারা সবসময় তৎপর থাকবেন এবং কর্তব্য থেকে বিচলিত হবেন না।
অন্য দিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জঙ্গলমহলের সার্বিক উন্নয়ন এবং স্থানীয় মানুষের সুবিধার্থে একাধিক প্রতিশ্রুতি দেন। ভারতীয় জনতা পার্টির প্রতিশ্রুতি রক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রামের মানুষ সরকারের চোখের আড়ালে নন, বরং তারা হৃদয়ে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, জঙ্গলমহলের পানীয় জল, রাস্তাঘাট এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি আশ্বাস দেন যে, বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, অন্নপূর্ণা যোজনা, আবাস যোজনার বাড়ি এবং স্থানীয় জনজাতি সংস্কৃতির সুরক্ষায় জাহের থান (পূজাস্থল) নির্মাণ, কমিউনিটি হল তৈরি ও লোকশিল্পীদের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এলাকার প্রয়োজনীয় দাবিদাওয়াগুলো চিহ্নিত করে তা পূরণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন ।
ভবিষ্যতে আবার আসবেন এই অনুষ্ঠানে, প্রতিশ্রুতি মুখ্যমন্ত্রীর। বলেন, "তখন আপনাদের হাতে গড়া পিঠে খেয়ে যাব।"
(ছবিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাতে স্বাধীনতা সংগ্রামী রঘুনাথ মাহাতোর মূর্তি তুলে দিচ্ছেন আদিবাসী কুড়মি সমাজের প্রধান নেতা অজিত প্রসাদ মাহাতো।)