সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:
একসময় অর্থের অভাবে অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবাকে চোখের সামনে শেষ হয়ে যেতে দেখেছিলেন। কলকাতার আর.জি. কর মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন ছাত্রটির বুকে সেদিন জমেছিল বাবাকে হারানোর এক তীব্র যন্ত্রণা ও অসহায়তা।
ভাগ্যের কী এক অদ্ভুত পরিহাস, সেই ছাত্রই আজ শল্য চিকিৎসক হয়ে নিজের হাত দিয়ে বদলে দিলেন আর এক ক্যান্সার রোগীর ভাগ্য। টানা ৯ ঘণ্টা ৩ মিনিটের এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের পর, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অত্যন্ত জটিল হুইপলস অপারেশন সফল করে এক নিঃস্ব রোগীকে জীবনের আলো দেখালেন দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগের নোডাল অফিসার চিকিৎসক পবন মণ্ডল ও তাঁর টিম।
পুরুলিয়ার ঝালদা ১ ব্লকের বুরুডি গ্রামের ৫৮ বছর বয়সী প্রান্তিক কৃষক বিরাজ কুমার হঠাৎই জানতে পারেন তাঁর অগ্ন্যাশয়ে থাবা বসিয়েছে মারণ ক্যান্সার। চিকিৎসার জন্য ঝাড়খণ্ডের রাঁচির হাসপাতালে ছোটেন তিনি। কিন্তু সেখানকার হাসপাতাল জানিয়ে দেয় অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়। বেসরকারি অন্য জায়গায় চিকিৎসা করাতে খরচ অন্তত ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা। গ্যারেজে সামান্য কাজ করা পরিবারের পক্ষে যা ছিল এক অসম্ভব স্বপ্ন। চরম হতাশায় যখন যন্ত্রণা ও অনবরত বমি নিয়ে শয্যাশায়ী রোগী, ঠিক তখনই বাঘমুন্ডির প্রাক্তন বিধায়ক নেপাল মাহাতোর নির্দেশে তিনি পৌঁছান দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক পবন মণ্ডলের কাছে।
পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজের ইতিহাসে ৯ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে এমন অতি-জটিল অস্ত্রোপচারের নজির এর আগে ছিল না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত কঠিন হিসেবে পরিচিত হুইপলস অপারেশন-র মাধ্যমে বিরাজবাবুর অগ্ন্যাশয়ের দুই-তৃতীয়াংশ, পাকস্থলীর একাংশ, পিত্তথলি, পিত্তনালি এবং সংলগ্ন লসিকা গ্রন্থি কেটে বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতি সূক্ষ্ম পুনর্গঠনের মাধ্যমে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে পুনরায় যুক্ত করেন চিকিৎসকেরা। সার্জারি বিভাগের 'মেডিক্যাল ইউনিট টু'-এর টিমে নোডাল অফিসার চিকিৎসক পবন মণ্ডল ছাড়াও ছিলেন ডাঃ সোমনাথ বিশ্বাস, ডাঃ মনিরুল ইসলাম, ডাঃ অর্চনা মিনা, ডাঃ গৌরব মিত্র ও ডাঃ মেঘা তামাং।
অস্ত্রোপচারের পর টানা তিন সপ্তাহ নিখুঁত পর্যবেক্ষণে রেখে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা হয় রোগীকে। তবে চিকিৎসকের দায়িত্ব কেবল ওখানেই শেষ হয়নি। হাসপাতাল থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে বুরুডি গ্রামে রোগীকে পৌঁছে দিতে নিজের খরচে গাড়ি ভাড়া করেন ওই চিকিৎসক। নিজে সঙ্গে গিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় বিরাজবাবুকে পরিবারের হাতে তুলে দেন।
শল্য চিকিৎসক পবন মণ্ডল বলেন, "অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে যখন বাবার প্রাণ যায়, তখন আমি আর.জি. করের ছাত্র। বাবাকে বাঁচাতে না পারার সেই যন্ত্রণা আজও আমাকে তাড়া করে। তাই যখনই অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত কোনো রোগী আমার সামনে আসেন, মনে হয় যেন নিজের বাবাই দাঁড়িয়ে আছেন। বিরাজবাবুকে সুস্থ করে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আজ মনে হচ্ছে বাবার প্রতি আমার এক অসমাপ্ত দায়িত্ব পালন করতে পারলাম।"
দীর্ঘ সাড়ে ৯ ঘণ্টার টানা অস্ত্রোপচার শেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে হাসি মুখে বাড়ি ফিরলেন পেশায় কৃষক বিরাজ কুমার। ঝালদার বিরুডি গ্রামের বাসিন্দা বিরাজ বাবু ও তাঁর পরিবারের কাছে এই লড়াইটা ছিল অত্যন্ত কষ্টের।
রোগী বিরাজ কুমার বলেন, "এক পয়সাও লাগেনি। সাধারণ ঘরের মানুষ আমি, বাইরে গেলে তো খরচই করতে পারতাম না। এত বড় অপারেশন সরকারি হাসপাতালে হবে ভাবতেই পারিনি। ডাক্তারবাবুকে অশেষ আশীর্বাদ।”
মেডিক্যাল কলেজ থেকে চিকিৎসা শেষে চিকিৎসক যখন রোগীকে নিজের গাড়িতে করে বাড়িতে নামিয়ে দিতে যান, তখন পুরো পরিবার জুড়ে যেন খুশির আমেজ। ওই পরিবারটি চিকিৎসককে দুপুরের আহারের আমন্ত্রণ জানালে সানন্দে তা গ্রহণ করেন তিনি। চিকিৎসকের এই রূপ দেখে আবেগে আপ্লুত রোগীর পরিবার।
রোগীর ছেলে জয়ন্ত কুমার বলেন, "আগে লোকমুখে শুনতাম উনি নাকি দরিদ্র মানুষের ভগবান। আজ নিজের চোখে তা দেখতে পেলাম। উনি শুধু আমার বাবার প্রাণ বাঁচাননি, একজন সন্তানের মতো আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এই ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারব না।"
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের এই আন্তরিকতা ও দক্ষতার নজির স্থানীয় মানুষ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।