সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:
রাজ্যজুড়ে থমকে থাকা ল্যাম্পসকে পুনরায় গতিশীল করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নেয়নকে ত্বরান্বিত করতে একগুচ্ছ তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ করল রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগ। আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যেই নিষ্ক্রিয় সমস্ত ল্যাম্পসে নির্বাচন সম্পন্ন করে নতুন পরিচালন সমিতি গঠনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুজোর আগেই কেন্দু পাতা সংগ্রাহকদের মুখে হাসি ফুটিয়ে পাতার সংগ্রহ মূল্য বাড়ানোর বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার পুরুলিয়া শহরের আদিবাসী উন্নয়ন কো-অপারেটিভ নিগম লিমিটেডের আঞ্চলিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে এই ঘোষণা করেন রাজ্য আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, "২০২৩ সাল থেকে রাজ্যের একাধিক ল্যাম্পস নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে আদিবাসী এলাকার সমবায় ভিত্তিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছিল। সরকারের মূল লক্ষ্য হল আগামী নভেম্বরের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন সেরে প্রতিটি ল্যাম্পসে নতুন পরিচালন সমিতি তৈরি করা, যাতে এই সমবায় নেটওয়ার্কের সুবিধা সরাসরি প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায়"।
এর পাশাপাশি, ল্যাম্পসগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া কর্মীর ঘাটতি মেটাতেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রক সূত্রের খবর, অনুমোদিত শূন্যপদগুলো দ্রুত পূরণের বিষয়টিকে রাজ্য সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। উল্লেখ্য, এই ল্যাম্পস কর্মীদের বেতন বাবদ সমস্ত খরচ রাজ্য সরকারই বহন করে থাকে।
আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের অন্যতম প্রধান জীবিকা কেন্দু পাতা সংগ্রহ। মন্ত্রীর কথায়, বর্তমানে প্রতি চাট্টা (বড়ো বান্ডিল) কেন্দু পাতার দাম ৬৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০ টাকা করার চিন্তাভাবনা করছে রাজ্য। সরকারি এই সিদ্ধান্তের আশ্বাস পাওয়ার পর থেকেই উচ্ছ্বসিত এলাকার সংগ্রাহক ও ল্যাম্পসের সদস্যরা।
এদিনের কর্মসূচিতে জেলায় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় থাকা মোট ৫৫ জন উপভোক্তার হাতে ৫১ লক্ষ ৯ হাজার টাকার সহায়তা চেক তুলে দেওয়া হয়।
টানা ৫ থেকে ১০ বছর ধরে পাতা সংগ্রহ করছেন এবং ৬০ বছর পূর্ণ করেছেন এমন ৪৭ জন পান এই সহায়তা।
কমপক্ষে ২ বছর কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও ৬০ বছর পেরোনো ৫ জন সংগ্রাহককে দেওয়া হয় এই অর্থ।৩টি মৃত সংগ্রাহক পরিবারকে দেওয়া হয় প্রতি পরিবার পিছু ৫৩ হাজার টাকা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পুরুলিয়া জেলায় মোট ২৩টি ল্যাম্পস রয়েছে, যার অধীনে নথিভুক্ত পুরুষ ও মহিলা সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৯ হাজার ৯৩৯ জন। চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কেবল পুরুলিয়াতেই ৯,৩২০ জন সংগ্রাহক সামাজিক সুরক্ষার আওতাভুক্ত হয়েছেন। এছাড়া গর্ভবতী মহিলা সংগ্রাহকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা হিসেবে ৬,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে বাম, তৃণমূল আমলে ল্যাম্পসের প্রকৃত সম্ভাবনাকে আদিবাসীদের স্বার্থে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি বলে যে খামতি ছিল, নতুন সরকার প্রথম থেকেই তা দূর করতে উদ্যোগী হয়েছে। এমন মন্তব্য করে পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো জানান, "আদিবাসী সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হল এই ল্যাম্পস। রাজ্য সরকারের এই সক্রিয় পদক্ষেপে প্রান্তিক মানুষ সরাসরি সুফল পাবেন।"
উক্ত অনুষ্ঠানে পুরুলিয়ার জেলাশাসক সুধীর কোন্তমের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন মানবাজারের বিধায়ক ময়না মুর্মু এবং বলরামপুরের বিধায়ক জলধর মাহাতো। নভেম্বরের নির্বাচন এবং প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি বাস্তবায়িত হলে জঙ্গলমহলের আদিবাসী অর্থনীতি নতুন গতি পাবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।