দেবীলাল মাহাতো, আড়শা:
একটা সময় ছিল, যখন উৎসব মানেই ছিল চেনা ছন্দ। সোলা, বাঁশ আর রঙিন কাগজের ছোঁয়ায় গড়ে উঠত শিল্প। সেই শিল্পেই ফুটে উঠত দেবীর অপরূপ রূপ। কিন্তু আজ সেই শিল্পই যেন পড়ে রয়েছে বিস্মৃতির অন্ধকার কোণে। আড়শা ব্লকের ঐতিহ্যবাহী ডাক শিল্প এখন শুধুই স্মৃতিচিহ্ন। বংশ পরম্পরায় যে শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন শিল্পীরা, আজ তাঁরাই কদর হারাচ্ছেন। দুর্গাপুজোর মরসুম এলেও নেই কাজের ব্যস্ততা, নেই আগের মতো বরাত। থিমের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সাবেকি ডাকের সাজ। উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার মাঝেই দিন গুজরান করছেন আড়শার ডাক শিল্পীরা।
জেলার যে কয়েকটি গ্রামে ডাক শিল্পের কাজ হয় , তার মধ্যে অন্যতম আড়শা ব্লকের বামুনডিহা গ্রাম। এই গ্রামের কুড়িটি যোগী পরিবার বংশানুক্রমে জড়িয়ে আছেন এই শিল্পের সঙ্গে। কিন্তু থিম পুজোর রমরমা আর কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় ,প্লাস্টিকে মোড়া চটকদার সৌন্দর্যের দাপটে আজ ম্লান হয়ে যাচ্ছে এই ডাক শিল্প। একসময় যাঁদের হাতে তৈরি প্রতিমার চালসাজ, মুকুট, হার, টিকলি, কানপাশা মাতিয়ে রাখত পুজোর মণ্ডপ, আজ তাঁরাই পড়ে রয়েছেন অবহেলায়। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে মূলধনের অভাব, সরকারি সাহায্য না মেলা আর বরাত কমে যাওয়ায় টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে শিল্পীদের। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিচ্ছেন বাপ-ঠাকুরদার এই পেশা, চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়।
গ্রামের ডাকশিল্পী শ্রীদাম যোগীর কথায়, "সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি এই সময়টার জন্যে । কিন্তু আগের মতো বরাত নেই।" একই সুর ভূদেব যোগী, দিলীপ যোগীর কথায়। তাদের আক্ষেপ,"আগে দুর্গাপুজোর এক মাস আগেই বরাত চলে আসতো। রাঁচি,ধানবাদ সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে বায়না চলে আসতো। এখন গ্রামাঞ্চলের কয়েকটি পুজো ছাড়া আর কেউ খোঁজ নেয় না। ফলে আমাদের কাজেও কমে গিয়েছে।"
রাজ্যে পরিবর্তনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং সাবেকিয়ানা দুর্গাপুজোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। আর তাতেই নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন বামুনডিহার ডাক শিল্পীরা। তাঁদের আশা, সরকারি সহযোগিতা পেলে, সাবেকি পুজোর কদর বাড়লে, হয়তো এবার দিনবদল ঘটবে। আবারও সোলা-বাঁশের কারুকার্যে জেগে উঠবে বামুনডিহা, ফিরবে হারানো গৌরব।