উৎসবের আলোয় শহর

পুজোর শতবর্ষে এসে চমকে দিচ্ছে পুরুলিয়া ধীবর সমিতি

শতবর্ষের এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু মণ্ডপসজ্জায় নয়, তার ইতিহাসেও। একশো বছর ধরে ধীবর সমিতির এই পুজোয় চাঁদা আদায়ের রীতি নেই। মা দুর্গার নামে রয়েছে পুকুর। সেই পুকুরের মাছ বিক্রি করেই মেটানো হয় পুজোর খরচ। পুজোর আয়োজন থেকে মন্দির নির্মাণ—সবেতেই জড়িয়ে রয়েছে সমিতির সদস্যদের শ্রম, আবেগ এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
পুজোর শতবর্ষে এসে চমকে দিচ্ছে পুরুলিয়া ধীবর সমিতি

 


সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:

দুর্গাপূজার শতবর্ষে পার্বতী পতিকেই থিম করেছে পুরুলিয়া ধীবর সমিতি। এই মন্দির সংলগ্ন রাস মেলায় মন্ডপ সজ্জায় তুলে ধরা হচ্ছে  দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গকে। থিম ‘নীলকণ্ঠ ধাম’। মণ্ডপসজ্জায় সোমনাথ থেকে রামেশ্বরম, কাশীধাম থেকে উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর। ভাস্কর রাহুল দাসের পরিকল্পনায় দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের শিল্পরূপ ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে মণ্ডপে। কলকাতার শহরতলি থেকে আনা আলোকসজ্জাতেও থাকছে বিশেষ চমক। আর পুজোর অন্যতম আকর্ষণ একাদশীর আতসবাজির প্রদর্শনী। ‘নীলকণ্ঠ ধাম’-এর শিল্পশৈলীকে রক্ষা করে রাতের আকাশে সাজিয়ে তোলা হবে আলোর উৎসব।


তবে শতবর্ষের এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু মণ্ডপসজ্জায় নয়, তার ইতিহাসেও। একশো বছর ধরে ধীবর সমিতির এই পুজোয় চাঁদা আদায়ের রীতি নেই। মা দুর্গার নামে রয়েছে পুকুর। সেই পুকুরের মাছ বিক্রি করেই মেটানো হয় পুজোর খরচ। পুজোর আয়োজন থেকে মন্দির নির্মাণ—সবেতেই জড়িয়ে রয়েছে সমিতির সদস্যদের শ্রম, আবেগ এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। পুজোর সূচনাপর্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জাতপাতের অপমানের কাহিনি।

কথিত আছে, এক সময় জাতিগত পরিচয়ের কারণে পুরুলিয়া শহরের চকবাজারের একটি দুর্গামন্দির থেকে ধীবরদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে মহাষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়া হয়নি তাঁদের। অপমানিত ও ক্ষুব্ধ ধীবররা সে দিনই বৈঠকে বসেন। সিদ্ধান্ত হয়, অন্যের ঠাকুরদালানে আর নয়, নিজেদের মন্দির তৈরি করে সেখানেই দুর্গার আরাধনা করবেন তাঁরা। সেই সিদ্ধান্তের পরেই শুরু হয় মন্দির তৈরির কাজ।

পুরুলিয়া ধীবর সমিতির পিওন বলে পরিচিত মধুসূদন ধীবর বলেন, "ধীবর সমিতির জেলিয়াপাড়ার দুর্গাপূজো এবার ১০০ বছরে পদার্পণ করেছে। অতীতে জাতিভেদের কারণে মন্দিরে পুষ্পাঞ্জলি দিতে না পেরে স্থানীয় ধীবর সম্প্রদায় নিজেরাই খড়ের ঝুপড়ি তুলে এই পূজোর সূচনা করেন এবং মেজিয়া ও দুর্গাপুর থেকে পুরোহিত এনে পূজো সম্পন্ন করতেন। মহাষ্টমীর পুজোর খ্যাতি আজ জেলার সীমানা ছাড়িয়ে ভিন জেলায়, ভিন রাজ্যেও।  একাদশীর বিখ্যাত বিসর্জন ও আতশবাজির জন্য পুরুলিয়াসহ দূর-দূরান্তের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এ বছর শতবর্ষ উপলক্ষে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গর আদলে বিশেষ মণ্ডপ তৈরি করে উদযাপনের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে"।

পুরুলিয়া ধীবর সমিতির পুজোর অংশীদার বাবলু ধীবর বলেন, " আমাদের পূর্বপুরুষরা চকবাজারে পুজো দিতে যেতেন। 'নিচু জাত' ও দরিদ্র বলে পূজা দিতে বাধা পাওয়ায় অপমানিত হয়ে তাঁরা সেখান থেকে চলে আসেন।  নীলকণ্ঠ বাবুর ওখানে পূজা দেন। পরবর্তীতে বাপ-ঠাকুরদাদারা চাঁদা তুলে, প্রয়োজনে জাল বন্ধক রেখে ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে নিজস্ব মন্দির গড়ে তুলে দুর্গাপূজা শুরু করেন। ১০০ বছরে পদার্পণ করা এই ঐতিহ্যবাহী পূজায় এবার দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের আদলে সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ।"

আয়োজকরা বলেন, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে খড়ের মন্দির তৈরি করে দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়। তত দিনে মন্দিরের জন্য দু’বিঘা জমিও দান করা হয়েছে। কিন্তু নতুন সমস্যা দেখা দেয় পুরোহিত পাওয়া নিয়ে। পুরুলিয়া শহরের পুরোহিতদের একাংশ জাতিগত পরিচয়ের কারণে ধীবর সমিতির পুজোয় পৌরোহিত্য করতে রাজি হননি বলে প্রচলিত রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে দেবীর স্বপ্নাদেশের কথা সামনে আসে। কথিত আছে, পুজো করবেন বাঁকুড়ার মেজিয়ার পুরোহিত, এমনই স্বপ্নাদেশ মিলেছিল। সেই সূত্রেই মেজিয়ায় যান ধীবররা। ‘পাগল ঠাকুর’ নামে পরিচিত এক চক্রবর্তী পুজোর দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন। তাঁর পৌরোহিত্যেই খড়ের মন্দিরে শুরু হয় দুর্গার আরাধনা। হয় মহাষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি।

পুরুলিয়া ধীবর সমিতির অন্যতম বরিষ্ঠ সদস্য দুলাল ধীবর  জানান, "উচ্চবর্ণের পুরোহিতরা তথাকথিত নিচু জাতের অজুহাতে আমাদের মন্দিরে পূজা করতে অস্বীকার করায়, মায়ের স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী বাঁকুড়ার মেজিয়া থেকে পুরোহিত এনে পূজা শুরু করা হয়। সেই ধারাবাহিকতা আজও বজায় রয়েছে। ১৩৩৪ সাল থেকে ওড়িশার মিস্ত্রি ও স্থানীয় কারিগরদের দিয়ে শুরু হওয়া মন্দির তৈরির কাজ পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে এখনও চলছে। প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের প্রবীণ সদস্য দুলাল ধীবর জানান, শতবর্ষ ছোঁয়া এই পূজার ঐতিহ্য এখন তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ও ধীবর সমিতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে"।

যে জায়গায় এখন মন্দির, এক সময় সেখানে ছিল বিশাল গর্ত। শহরের জল জমত সেখানে। কেশব ধীবর, তিনকড়ি ধীবর, বঙ্কু ধীবর-সহ সমিতির সদস্যরা বালি, পাথর ও সিমেন্ট দিয়ে সেই গর্ত ভরাট করে মন্দিরের ভিত তৈরি করেছিলেন। শতবর্ষের দোরগোড়ায় পৌঁছেও মন্দির নির্মাণের কাজ থেমে নেই। এখনও চলছে শেষ পর্যায়ের সাজসজ্জা ও পরিমার্জন। এক সময় যে পুজো শুরু হয়েছিল মাত্র ৪৬ জন অংশীদারকে নিয়ে, বর্তমানে তার সঙ্গে যুক্ত ২২৫ জন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পুজোর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ধীবর সমিতির সদস্যরা। পুজোর পৌরোহিত্যেও রয়েছে সেই ধারাবাহিকতা। মেজিয়ার চক্রবর্তী পরিবারের পুরোহিতেরাই বংশপরম্পরায় পুজো করে আসছেন। এ বার শতবর্ষের পুজোয় সেই দায়িত্বে থাকবেন বর্তমান পুরোহিত নন্টু চক্রবর্তী।

ধীবর সমিতির মন্দিরে গিয়ে দেখা গেল, ভিতরে চলছে আর এক প্রস্তুতি। দরজা বন্ধ করে আলো জ্বালিয়ে মাতৃপ্রতিমা গড়ার শেষ পর্যায়ের কাজ করছেন ধীবর সমিতির সদস্য তথা মৃৎশিল্পী শান্তনু ধীবর। তাঁর নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে ২২ ফুটের সাবেকি দুর্গাপ্রতিমা। শতবর্ষের আবেগ, ঐতিহ্য আর দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়ে এ বারও ধীবর সমিতির পুজোয় দেবী আরাধনার অপেক্ষা।