স্বাস্থ্য শহর

ক্যান্সার রোগীকে সুস্থ করে ভাড়া গাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন পুরুলিয়ার চিকিৎসক

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে প্রায়শই নানা ক্ষোভের কথা শোনা যায়, সেখানে পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এই সাফল্য সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের ভরসা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। আর ডাঃ পবন মণ্ডলের মতো চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দেন, স্টেথোস্কোপের ওপারে এখনো একটা সংবেদনশীল মানবিক হৃদয় স্পন্দিত হয়।
ক্যান্সার রোগীকে সুস্থ করে ভাড়া গাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন পুরুলিয়ার চিকিৎসক

 

সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:


ক্যান্সার মানেই কি জীবন শেষ? বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামের এক দরিদ্র আদিবাসী পরিবারের কাছে এই রোগ তো কার্যত মৃত্যুদণ্ডের সমান। কিন্তু সেই চেনা নির্মম গল্পটাকেই বদলে দিল পুরুলিয়া গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। অভাব আর মারণ রোগের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসা এক প্রৌঢ়াকে শুধু সুস্থই করে তুললেন না চিকিৎসকেরা, মানবিকতার এক অনন্য নজির গড়ে রোগীকে নিজের গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিলেন শল্য চিকিৎসক ডাঃ পবন মণ্ডল।

চিকিৎসক পবন মণ্ডলের কাছে এই অপারেশনটা শুধু আর পাঁচটা সার্জারির মতো ছিল না। এর সাথে জড়িয়ে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত এক আবেগ ও লড়াইয়ের অতীত।

শল্য চিকিৎসক ডাঃ পবন মন্ডল বলেন, "আমি যখন ডাক্তারি পড়ছি, তখন আমার বাবা ঠিক এই পেরিয়াম্পুলারি ক্যান্সারেই  আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে যান। তখন অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আমার কিছু করার ছিল না। যখন এই ৫২ বছর বয়সী আদিবাসী মা আমার কাছে এলেন, আমি ওঁর মধ্যে আমার বাবাকে দেখতে পেয়েছিলাম। তখনই মনে মনে পণ করি, বাবাকে যেভাবে হারিয়েছি, এই মাকে সেভাবে হারাতে দেব না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ৭ জনের চিকিৎসক টিমের যৌথ প্রচেষ্টায় টানা ৭ ঘণ্টার জটিল অপারেশনের পর আজ উনি সম্পূর্ণ সুস্থ। ওঁর এই হেঁটে বাড়ি ফেরাটা আমার কাছে বাবার ফিরে আসার মতোই আনন্দের।"


ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী মিনি মান্ডি বলেন, "আমি তো ভেবেছিলাম আর বাঁচব না। পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করতাম। সবাই বলত ক্যান্সার হলে নাকি আর কেউ ফেরে না। তার ওপর আমাদের মতো গরিব মানুষের এত বড় রোগের চিকিৎসা করানোর ক্ষমতাই ছিল না। কিন্তু ডাক্তারবাবু ডাঃ পবন মণ্ডল ভগবানের মতো এসে আমার হাত ধরলেন। আজ আমি নিজের পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছি। ডাক্তারবাবু নিজে গাড়ি করে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন, এটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। উনি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন।"

রোগীর জামাই ডাঠু সরেন বলেন, "ক্যান্সারের নাম শুনেই আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাবে ভেবে আমরা চোখের জল ফেলছিলাম। কিন্তু পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারবাবুরা আমাদের আশ্বস্ত করেন।  ১৩ মে যখন ৭ ঘণ্টা ধরে অপারেশন চলছিল, আমরা বাইরে ঈশ্বরের নাম জপছিলাম। আজ শাশুড়ি মাকে সুস্থ শরীরে বাড়ি নিয়ে যেতে পারছি। আর ডাক্তারবাবু যেভাবে আমাদের নিজের গাড়িতে বসিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিলেন, সেই ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারব না।"
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে প্রায়শই নানা ক্ষোভের কথা শোনা যায়, সেখানে পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এই সাফল্য সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের ভরসা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। আর ডাঃ পবন মণ্ডলের মতো চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দেন, স্টেথোস্কোপের ওপারে এখনো একটা সংবেদনশীল মানবিক হৃদয় স্পন্দিত হয়।