স্বাস্থ্য ব্লক শহর

পারেনি কলকাতা, চর্ম ক্যান্সারের রোগীকে নতুন জীবন, চিকিৎসক দিবসে নজির পুরুলিয়ার মেডিক্যাল কলেজের

এক অবিশ্বাস্য অস্ত্রোপচার চালালেন হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘বাসেল সেল কারসিনোমা’ তেমনই এক মারণ চর্ম ক্যান্সারের টিউমার সফলভাবে কেটে বাদ দিলেন তাঁরা।
পারেনি কলকাতা, চর্ম ক্যান্সারের রোগীকে নতুন জীবন, চিকিৎসক দিবসে নজির পুরুলিয়ার মেডিক্যাল কলেজের

 

নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:

চিকিৎসক দিবসে যেখানে চারিদিকে শুধুই শুভেচ্ছা বার্তার জোয়ার, ঠিক তখনই হাসপাতালের চার দেওয়ালের ভেতর এক নিঃশব্দ লড়াইয়ে ইতিহাস গড়লেন পুরুলিয়ার একদল চিকিৎসক। কলকাতা সহ রাজ্যের একাধিক নামী বেসরকারি হাসপাতাল যে রোগীকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই রোগীকে নতুন জীবনদান করে নজির গড়ল পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।

সাধারণত চর্ম বিভাগে জটিল অস্ত্রোপচারের পরিকাঠামো কোনোটিই থাকে না। কিন্তু সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ও‘হেপাটাইটিস-বি’ সংক্রমণের চরম ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এক অবিশ্বাস্য অস্ত্রোপচার চালালেন হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘বাসেল সেল কারসিনোমা’ তেমনই এক মারণ চর্ম ক্যান্সারের টিউমার সফলভাবে কেটে বাদ দিলেন তাঁরা।

পুরুলিয়ার জয়পুরের বাসিন্দা ৫১ বছর বয়সী চাঁদমনি মাহাতো দীর্ঘদিন ধরেই চর্ম ক্যান্সারে ভুগছিলেন। কিন্তু তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিল ‘হেপাটাইটিস-বি’ ভাইরাস। এই মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির কারণে অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকদের নিজেদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে প্রবল। আর এই অজুহাতেই কলকাতার একাধিক নামী হাসপাতাল ও চর্ম বিশেষজ্ঞরা অস্ত্রোপচার করতে অস্বীকার করেন।

নিরাশ হয়ে দিনকয়েক আগে চাঁদমনি দেবী দেবেন মাহাতো মেডিক্যাল কলেজের আউটডোরে আসেন। আট দিন ধরে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকার পর, ১জুলাই ‘চিকিৎসক দিবস’ বা ডক্টরস ডের পুণ্যলগ্নেই এই কঠিন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন হাসপাতালের চর্ম বিভাগের প্রধান চিকিৎসক সোমনাথ সরকার ও তাঁর দল।
বুধবার দুপুর  ১২টায় শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচার। হেপাটাইটিস- বি ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে চিকিৎসকরা নিজেদের মুড়ে ফেলেছিলেন ভারী পিপিই  কিটে। দীর্ঘ ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে সফলভাবে শেষ হয় অস্ত্রোপচার। চর্ম বিভাগীয় প্রধান সোমনাথ সরকারের নেতৃত্বে এই অসাধ্য সাধনকারী দলে ছিলেন চিকিৎসক দীপ্র বিশ্বাস, স্নেহা ও তামান্না দোকানিয়া।


চর্ম বিভাগের  প্রধান. ডাঃ সোমনাথ সরকার বলেন, "হেপাটাইটিস-বি পজিটিভ হওয়ার কারণে অনেকেই এই রোগীকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা চিকিৎসক দিবসের দিনই এই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিই। বর্তমানে রোগী সম্পূর্ণ স্থিতিশীল আছেন।"

পরিকাঠামোর অভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চর্ম বিভাগের এই অভাবনীয় সাফল্যকে কুর্নিশ জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সাধারণত জেনারেল সার্জারি বা অঙ্কোলজি বিভাগে এই ধরনের জটিল ক্যানসার অস্ত্রোপচার হলেও, চর্ম বিভাগের চিকিৎসকদের এই পারদর্শিতা এক নতুন নজির তৈরি করল।

হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট তথা ভাইস প্রিন্সিপাল সুকোমল বিষয়ী চিকিৎসকদের এই সাহসিকতার প্রশংসা করে জানান, "এই ধরনের জটিল সার্জারি সাধারণত চর্ম বিভাগে ভাবাই যায় না। আমাদের চিকিৎসকরা সীমিত পরিকাঠামোতেই যা করে দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অভাবনীয় ও প্রশংসার যোগ্য।এই ঘটনা প্রমাণ করল যে, সদিচ্ছা ও দক্ষতা থাকলে মফস্বলের হাসপাতালেও বিশ্বমানের চিকিৎসা সম্ভব"।