নিজস্ব প্রতিনিধি, মানবাজার:
আর কেউ আমাদের ঠকাতে
পারবে না!" এক বুক আত্মবিশ্বাস আর মুখে হাসি নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন পুরুলিয়ার সন্ধ্যা হাঁসদা, নূপুর মুর্মু বা পুতুল বাউরী। জীবনের একটা বড় সময় কাটানোর পর, অবশেষে তাঁদের আঙুলের টিপছাপের জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে সগর্বে লেখা নিজের নাম। শুধু সন্ধ্যা বা নূপুর নন, তাঁদের মতো পুরুলিয়ার প্রায় ৫৭৬ জন বয়স্ক মানুষের জীবনে এই অক্ষরের আলো বয়ে এনেছে এক অনন্য উদ্যোগ।
গত দু' বছর ধরে চলা নিরক্ষরতা দূরীকরণের এক নীরব বিপ্লবের পর, সম্প্রতি জেলা জুড়ে সম্পন্ন হলো এই নতুন পড়ুয়াদের অগ্রগতি মূল্যায়নের কাজ। তবে এই মূল্যায়ন আর পাঁচটা সাধারণ পরীক্ষার মতো ভীতিপ্রদ ছিল না বরং তা রূপ নিয়েছিল এক সামাজিক উৎসবে।
আমেরিকার মাউন্ট এরি এবং পুরুলিয়া রোটারী ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে এবং গোবিন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় ‘হ্যানসন গ্লোবাল গ্র্যান্ট’-এর অধীনে বিগত দুই বছর ধরে এলাকায় ৫০টি সাক্ষরতা কেন্দ্র চালানো হচ্ছিল। নিরক্ষরতার অভিশাপ মুছে দেশকে স্বাবলম্বী করতে প্রতি সপ্তাহে দু' দিন করে ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী বা শিক্ষা সেবী এই কেন্দ্রগুলিতে আলো ছড়ানোর কাজ করেছেন।
মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা ‘বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি’ প্রথাগত পরীক্ষার গণ্ডি ভেঙে পুরো বিষয়টিকে একটি আনন্দোৎসবের রূপ দেয়। খাতা-কলমের ভয় কাটিয়ে উৎসবের মেজাজে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে এই মূল্যায়নে যোগ দেন গ্রামের বয়স্ক পুরুষ ও মায়েরা। নিজের নাম লেখা বা সহজ হিসেব কষতে পেরে তাঁদের চোখে-মুখে তখন আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক।
এই মহতী উদ্যোগের অন্যতম কাণ্ডারী, গোবিন্দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমিতাভ মিশ্র আবেগঘন কণ্ঠে জানান, "নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও এই বয়সে এসেও যেভাবে বয়স্ক মানুষেরা নিয়মিত কেন্দ্রে এসে পড়াশোনা করেছেন, তা আমাদের কৃতজ্ঞ করেছে। সমাজের অভিশাপ দূর করতে তাঁদের এই ইচ্ছেশক্তি সত্যিই শিক্ষণীয়।"
মূল্যায়ন শেষে পরীক্ষক সংস্থার পক্ষে অনুপ সরকার অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, "শুধু অক্ষর চেনানোই শেষ কথা নয়, আগামী দিনে এই নব সাক্ষরদের অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে বিভিন্ন ধরনের হস্ত শিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে"।
এই মূল্যায়নের আবহ দেখতে আমেরিকার প্রবাসী ড. পল মাহাতো সুদূর মার্কিন মুলুক থেকেই সমস্ত নব সাক্ষরদের অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। পাশাপাশি, মূল্যায়ন কেন্দ্রগুলি সশরীরে ঘুরে দেখে সাধারণ মানুষের এই উদ্দীপনা প্রত্যক্ষ করেন রোটারী ক্লাবের প্রতিনিধি অমিতাভ লোহারিওয়াল ও রাজকুমার শীল।