শিক্ষা সংস্কৃতি ব্লক

হাতে গাছের চারা, বুকে মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা: সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে কুড়মালি পড়ুয়াদের অভিনব বিদায়

বিদায়ী পড়ুয়াদের হাতে স্মারক হিসেবে অ্যাকাডেমিক ক্যাপের পাশাপাশি একটি করে গাছের চারা তুলে দেন দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র-ছাত্রীরা। এটি কেবল একটি উপহার ছিল না, বরং আগামী দিনে জ্ঞান, বিকাশ ও পরিবেশ বাঁচানোর এক দারুণ সুন্দর বার্তা।
হাতে গাছের চারা, বুকে মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা: সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে কুড়মালি পড়ুয়াদের অভিনব বিদায়

 


শুভদীপ মাহাত▪️পুরুলিয়া:

বিদায় মানেই কেবল শেষ নয়, বরং এক নতুন দায়িত্বের শুরু। শনিবার পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুড়মালি বিভাগে ঠিক এমনই এক ছবি ধরা পড়ল। এম.এ. চতুর্থ সেমিস্টারের (২০২৪–২০২৬ ব্যাচ) পড়ুয়াদের বিদায় সংবর্ধনায় শুধু স্মৃতি মেদুরতা ছিল না, ছিল মাতৃভাষা, সাহিত্য ও নিজস্ব সংস্কৃতির প্রসারে কাজ করার এক দৃঢ় শপথ।

এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন কুড়মালি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান তথা গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. সনৎ কুমার মাহাতো। তিনি পড়ুয়াদের এক বৃহত্তর জীবনের পাঠ দিয়ে বলেন, "কেবল স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করাই শেষ লক্ষ্য নয়; সমাজ, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্ব পালন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ"। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গত দু'বছরে পাওয়া পুঁথিগত শিক্ষাকে এবার সমাজকল্যাণ ও সাহিত্যচর্চায় কাজে লাগাতে হবে। পড়ুয়াদের লেখা গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস বা গবেষণামূলক কাজ যাতে হারিয়ে না যায়, তার জন্য কুড়মালি ভাষার পাক্ষিক সংবাদপত্র "নাউআ বিহান"-এ সেগুলি প্রকাশের বিশেষ আশ্বাসও দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কুড়মালি কবি ও সাহিত্যিক সুনীল কুমার মাহাত। কুড়মালি ভাষার অতীত, বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "নতুন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চাই কুড়মালি ভাষার ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করবে"।

পড়ুয়াদের আগামী দিনে কুড়মালি ভাষার প্রচার, প্রসার ও গবেষণায় আরও বেশি করে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন বিভাগের চুক্তিভিত্তিক সহকারী অধ্যাপক হীরালাল মাহাত। অন্যদিকে, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব বোঝাতে একটি দারুণ অনুপ্রেরণামূলক গল্প শোনান শিক্ষিকা মঞ্জু মাহাত। তরুণ লেখকদের পাশে থাকার বার্তা দেন "নাউআ বিহান"-এর প্রধান সম্পাদক তথা অতিথি শিক্ষক সুরেশ কুড়মি। তিনি জানান, নতুন প্রজন্মের কলমে উঠে আসা সাহিত্যকর্ম তাঁর পত্রিকায় অগ্রাধিকার পাবে।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিথি শিক্ষক রাজকিশোর মাহাত, আশিস মাহাত, প্রথম মাহাতো, ধীরেন চন্দ্র মাহাত, উত্তম মাহাত, বিনোদ মাহাত, গৌতম মাহাত, পিন্টু মাহাত, আদর্শন মাহাত, দীননাথ মাহাত, জয়ন্তী মাহাত এবং মহাবীর মাহাত সহ অন্যান্যরা। তাঁরা সকলেই মাতৃভাষার প্রসারে পড়ুয়াদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

তবে এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তটি তৈরি হয় একেবারে শেষ পর্বে। বিদায়ী পড়ুয়াদের হাতে স্মারক হিসেবে অ্যাকাডেমিক ক্যাপের পাশাপাশি একটি করে গাছের চারা তুলে দেন দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্র-ছাত্রীরা। এটি কেবল একটি উপহার ছিল না, বরং আগামী দিনে জ্ঞান, বিকাশ ও পরিবেশ বাঁচানোর এক দারুণ সুন্দর বার্তা। আবেগঘন এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো দুই বছরের নানা সুন্দর স্মৃতি সবার সঙ্গে ভাগ করে নেন বিদায়ী পড়ুয়ারা, জানান শিক্ষকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

সব মিলিয়ে, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিদায় সংবর্ধনা হয়ে উঠল কুড়মালি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আগামী প্রজন্মের হাত ধরে বাঁচিয়ে রাখার এক নতুন অঙ্গীকারের মঞ্চ।