সংস্কৃতি শহর

পুরুলিয়ায় ভারত কেশরীর জন্মজয়ন্তীতে ইতিহাস দেখছে নতুন আলো

এতদিন ধরে ড. মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাসকে যেভাবে আড়ালে বা বিকৃত করে রাখা হয়েছিল, এই ধরনের অনুষ্ঠান তা দূর করতে সাহায্য করবে বলে মনে করছেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা।
পুরুলিয়ায় ভারত কেশরীর জন্মজয়ন্তীতে ইতিহাস দেখছে নতুন আলো

 

সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:

ইতিহাসের সত্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এবং বাংলার গঠনে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অনবদ্য অবদানকে স্মরণ করতে পুরুলিয়া রবীন্দ্র ভবনে আয়োজিত হলো এক বিশেষ অনুষ্ঠান। ভারত কেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫ তম জন্মজয়ন্তী।  রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত এই জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি স্কুল পড়ুয়াদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এতদিন ধরে ড. মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাসকে যেভাবে আড়ালে বা বিকৃত করে রাখা হয়েছিল, এই ধরনের অনুষ্ঠান তা দূর করতে সাহায্য করবে বলে মনে করছেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার কুমার শানি রাজ উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রী ও বিশিষ্টজনদের উদ্দেশে আজকের দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন বলেন,"তরুণ প্রজন্মই দেশের আসল ভবিষ্যৎ। তাই কেন সমগ্র জেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও পুলিশ প্রশাসনের আধিকারিকরা নিজেদের দৈনন্দিন কাজ সরিয়ে আজ এখানে সমবেত হয়েছেন, তা যুবসমাজের জানা দরকার।"

তিনি মনে করিয়ে দেন, কিছুদিন আগেই রাজ্যে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালিত হয়েছে, যার নেপথ্যে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান অনস্বীকার্য। হুগলিতে তাঁর সভাপতিত্বেই প্রস্তাব পাস হয়েছিল যে এই বাংলা ভারতের অংশ হিসেবেই থাকবে। তৎকালীন অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর কঠোর পরিশ্রম ও আইনি লড়াইয়ের ফলেই আজকের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অস্তিত্ব।" শিক্ষার্থীদের প্রতি পুলিশ সুপারের আহ্বান, তাঁরা যেন বর্তমান প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করে স্মার্টফোনের মাধ্যমে এই মহান মনীষীর জীবনী আরও বিশদে পাঠ করে।

জেলাশাসক সুধীর কোন্থম ড. মুখোপাধ্যায়ের জীবন, আদর্শ ও দেশের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, অত্যন্ত কম বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনিষ্ঠতম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব সামলেছিলেন এই শিক্ষাবিদ। স্বাধীন ভারতের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে জেলাশাসক বলেন, "দেশভাগের পর অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শিল্পায়ন ও শরণার্থী পুনর্বাসনের মতো জটিল চ্যালেঞ্জগুলো তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলেছিলেন তিনি। নাগরিক স্বাধীনতা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও শিক্ষার প্রসারে তাঁর আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক এবং তা থেকে বর্তমান প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে"।


বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে ইতিহাসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "পুরুলিয়ার বহু বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েই জানে না যে ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর পুরুলিয়া জেলার সৃষ্টি হয়েছিল, যা এই জেলার জন্মদিন।" একসময়ের বিহারের অন্তর্ভুক্ত ‘মানভূম ডিস্ট্রিক্ট’ যে এক রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, তা মনে করিয়ে দেন তিনি।

ড.  মুখোপাধ্যায় প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি আরও জানান," তিনি কেবল একজন দার্শনিক বা শিক্ষাবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘জনসংঘ’ই আজকের ভারতীয় জনতা পার্টি।"

অনুষ্ঠানে উপস্থিত পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের দশম শ্রেণীর এক ছাত্রের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। 
সে সরাসরি জানায়, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনীকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থে বিকৃত ও কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আজকের এই আয়োজনের মাধ্যমে তারা প্রকৃত সত্য জানতে পারছে।
কাশ্মীরে ভারতীয়দের অবাধ প্রবেশের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ড. মুখোপাধ্যায়ের গ্রেফতারি এবং সেখানে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যুর ইতিহাস তারা আগেই জানত উল্লেখ করে ছাত্রটি বলে, দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা এই অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত তাদের কাছে অত্যন্ত শিক্ষণীয় ছিল এবং এখান থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান তাদের ভবিষ্যতে পথ চলতে সাহায্য করবে।