সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:
১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে অতীতে ঘটে যাওয়া দেদার গাফিলতি ও দুর্নীতির অধ্যায়কে এবার চিরতরে বন্ধ করতে কোমর বাঁধছে প্রশাসন। কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ে দেশজুড়ে শুরু হওয়া ‘বিকশিত ভারত- রোজগার ও আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’ বা ‘ভিবি-জি রামজি’ প্রকল্পের জেলাস্তরের আনুষ্ঠানিক সূচনা মঞ্চ থেকে এমনই কড়া বার্তা দিলেন পুরুলিয়ার বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায়।
বৃহস্পতিবার পুরুলিয়া ২ নম্বর ব্লকের হাতোয়াড়ায় কৃষি দপ্তরের জেলা বীজ খামারে একটি পুকুর খনন কাজের সূচনা করেন বিধায়ক। গাঁইতি দিয়ে মাটি কেটে প্রকল্পের কাজ শুরু করার পর, উপস্থিত তৃণমূলের গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানদের কার্যত কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সুদীপ মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "এখানে সমস্ত প্রধানরাই উপস্থিত রয়েছেন। আপনাদের সামনেই বলছি, আগে ১০০ দিনের প্রকল্পে অনেক গাফিলতি ও অনিয়ম হয়েছে। এবার যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়। নতুন প্রকল্পে কোনো রকম দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না।"
নতুন এই প্রকল্পে অদক্ষ শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ২৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়েছে। ১০০ দিনের কাজের পরিধি বাড়িয়ে এবার মিলবে ১২৫ দিনের কাজ।
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, পূর্ববর্তী ১০০ দিনের কাজের ফাঁকফোকর ও 'ভুয়ো' শ্রমিক রুখতে এবার প্রযুক্তির চরম ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রকল্পে দুর্নীতি রুখতে জব কার্ড হোল্ডারদের 'ফেস অথেন্টিকেশন' বা মুখের অবয়ব দিয়ে পরিচয় যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি আঙুলের ছাপ বা পাসওয়ার্ডের মতোই একটি নিশ্ছিদ্র ডিজিটাল ব্যবস্থা, যা জাল করা অসম্ভব।
তবে এই প্রযুক্তির কারণেই পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ আড়াই লক্ষাধিক শ্রমিকের ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন করা।
জেলার মোট ১১ লক্ষ ২৩ হাজার ৩৭৯ জন শ্রমিকের মধ্যে ৮ লক্ষ ৬০ হাজার ৬৪৮ জনের (৭৭ শতাংশ) ই-কেওয়াইসি হয়েছে। এখনও প্রায় ২৩ শতাংশ অর্থাৎ আড়াই লাখের বেশি শ্রমিকের ই-কেওয়াইসি বাকি।
যেহেতু জঙ্গলমহলের এই দরিদ্র জেলা থেকে বহু মানুষ ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে যান, তাই দ্রুত এই প্রক্রিয়া শেষ করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নামছে জেলা প্রশাসন। জেলাশাসক (সাধারণ) উৎকর্ষ সিং এবং নোডাল অফিসার তমালকৃষ্ণ ডাকুয়ার উপস্থিতিতে জানানো হয়, বাকি থাকা শ্রমিকদের ই-কেওয়াইসি দ্রুত শেষ করা হবে, যাতে কেউ কাজ থেকে বঞ্চিত না হন।
আগে ১০০ দিনের কাজের সমস্ত তথ্য সরাসরি 'এনআরইজিএ সফ্ট' এ নথিভুক্ত হতো। কিন্তু এবার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রথমে 'যুক্তিধারা' পোর্টালে সমস্ত তথ্য ও কাজের তালিকা আপলোড করা হবে, তারপর তা এনআরইজিএ সফ্ট-এ পাঠানো হবে।
তাছাড়া, আগে ১০০ দিনের প্রকল্পে কৃষি মরশুমের মধ্যেই ৬০ দিন কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও, নতুন ভিবি-জি রামজি প্রকল্পে কৃষি মরশুম বাদে শ্রমিকদের অন্তত ৬০ দিন কাজ দিতেই হবে। পুরো বিষয়টি সরাসরি রাজ্যস্তর থেকে মুখ্যসচিব বা অতিরিক্ত মুখ্যসচিব পর্যায়ের আধিকারিকদের নিয়ে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির মাধ্যমে কড়া নজরদারিতে থাকবে।
পুরুলিয়া জেলার ১৭০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায় ১২০টি কাজের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে আপাতত জঙ্গলমহলের ৪৩টি গ্রাম পঞ্চায়েত একটি করে কাজ শুরু করে দিয়েছে। ১ জুলাই থেকে কাজ শুরু হলেও, বৃহস্পতিবার ছিল এর আনুষ্ঠানিক রাজ্যব্যাপী উদ্বোধন।
এদিনের জনসম্মেলনে বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায় এই প্রকল্পের সমস্ত নিয়মকানুন সম্বলিত একটি সরকারি পুস্তিকার আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানে বিডিও পুষ্পেন্দু সাহা, রাঘবপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান দীনবন্ধু মাহাতো ও সমাজসেবী বিবেক রাঙ্গা সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।