উৎসবের আলোয় ধর্ম ও পুজোপাঠ শহর

রথের আগে কড়া নিরাপত্তা, পুরুলিয়ায় পুলিশের রুট মার্চ, সিসি ক্যামেরায় নজরদারির ব্যবস্থা

পুরুলিয়া শহরের ঐতিহ্যবাহী মণি বাইজির ১১৫ বছরের প্রাচীন রথযাত্রাকে সামনে রেখে বুধবার পুরুলিয়া শহরের চকবাজার-সহ সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ টহলদারি চালালো পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার কুমার শানি রাজের নেতৃত্বে টাউন থানার আইসি ও পুলিশের একটি দল শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় রুট মার্চ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন।
রথের আগে কড়া নিরাপত্তা, পুরুলিয়ায় পুলিশের রুট মার্চ, সিসি ক্যামেরায় নজরদারির ব্যবস্থা

 

 

সুইটি চন্দ্র , পুরুলিয়া:

বৃহস্পতিবার রথযাত্রা। আর সেই উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তায় কোনও ফাঁক রাখতে চাইছে না জেলা পুলিশ। পুরুলিয়া শহরের ঐতিহ্যবাহী মণি বাইজির ১১৫ বছরের প্রাচীন রথযাত্রাকে সামনে রেখে বুধবার পুরুলিয়া শহরের চকবাজার-সহ সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ টহলদারি চালালো পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার কুমার শানি রাজের নেতৃত্বে টাউন থানার আইসি ও পুলিশের একটি দল শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় রুট মার্চ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রথযাত্রার দিন ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচল সচল রাখা এবং কোনও রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই আগাম এই প্রস্তুতি। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে গোটা রথযাত্রার উপর নজরদারি চালানো হবে। সাদা পোশাকের পুলিশকর্মীরাও ভিড়ের মধ্যে দায়িত্ব পালন করবেন।

পুরুলিয়ার এই রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর জেলার নানা প্রান্তের পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড-সহ পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকেও হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থী আসেন এই রথ দেখতে। চকবাজারের রাধাগোবিন্দজিউ মন্দির থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রথ পৌঁছায় রথতলায়। রথের দড়িতে হাত ছোঁয়ানোর জন্য ভক্তদের মধ্যে থাকে প্রবল উৎসাহ।

লোকমুখে এই রথ ‘মণি বাইজির রথ’ নামেই বেশি পরিচিত। তবে ইতিহাস বলছে, মণি বাইজি আদতে পুরুলিয়ার বাসিন্দা ছিলেন না। পঞ্চকোট রাজবংশের রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ সিং দেও নাচ-গানের প্রতি অনুরাগ থেকে লখনউ থেকে মুন্নি বাই নামে এক শিল্পীকে পুরুলিয়ায় নিয়ে আসেন। পরে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নিয়ে তাঁর নাম হয় মনমোহিনী বৈষ্ণবী। জীবনের শেষ পর্বে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ভক্তি ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে উৎসর্গ করেন।

১৮৯৮ সালে চকবাজারে রাধাগোবিন্দজিউর মন্দির প্রতিষ্ঠার পর তাঁর উদ্যোগেই শুরু হয় রথ নির্মাণের পরিকল্পনা। বাঁকুড়ার প্রখ্যাত কারিগর আশুতোষ কর্মকারের হাতে তৈরি হয় পিতলের সেই অনন্য রথ। ১৯১২ সালে প্রথমবার পুরুলিয়ার রাজপথে গড়ায় রথের চাকা। প্রায় ২২ ফুট উঁচু এবং ১২ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের সেই রথ নানা দেবদেবীর মূর্তি ও সূক্ষ্ম কারুকাজে সজ্জিত ছিল। ১৯১৮ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতি বছর রথযাত্রায় উপস্থিত থাকতেন মনমোহিনী বৈষ্ণবী।

সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে রথযাত্রার আয়োজনও। একসময় সূর্যাস্তের আগেই রথযাত্রা শেষ হয়ে যেত। ১৯৬৩ সালে প্রথম গ্যাসবাতির আলোয় সন্ধ্যার পরে রথ টানার সূচনা হয়। ১৯৭১ সালে যুক্ত হয় বৈদ্যুতিক আলোর সাজ। শহরের রাস্তা ক্রমশ সরু হয়ে যাওয়ায় ১৯৬৯ সালে কারিগর গিরিধারী কর্মকার রথের চার দিক থেকে প্রায় দুই ফুট করে কমিয়ে বর্তমান আকার দেন। পরে ২০০০ সাল থেকে ট্রাক্টরের সাহায্যে রথ টানার ব্যবস্থা চালু হয়। তবে আজও হাজার হাজার মানুষ রথের দড়িতে হাত ছুঁইয়ে এই শতবর্ষপ্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠেন।

এ বছরও সেই ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে প্রস্তুত পুরুলিয়া। প্রশাসনের আশা, কড়া নিরাপত্তা ও সুসংহত ব্যবস্থাপনার মধ্যেই নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই রথযাত্রা।