রাজনীতি ক্রাইম ব্লক শহর

জন্মদিনে গ্রেপ্তার হয়ে বিরাট প্যাঁচে সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়, মিললো না জামিন

পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতরা তদন্তে একেবারেই সহযোগিতা করছেন না। সমস্ত ‘মিসিং লিঙ্ক’ উদ্ধার করতে ধৃতদের ম্যারাথন জেরা করতে চাইছে পুরুলিয়া জেলা পুলিশ।
জন্মদিনে গ্রেপ্তার হয়ে বিরাট প্যাঁচে সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়, মিললো না জামিন

 


নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:

জামিন তো মেলেইনি, উল্টে আইনি জাঁতাকলে আরও জবুথবু অবস্থা পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি তথা বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের।  সরকারি নথি বিকৃত করার কাজে মদত দেওয়ার অভিযোগে পুঞ্চা থানার হাতে নিজের জন্মদিন ১১ জুলাই গ্রেপ্তার হয়ে শ্রীঘরে ঠাঁই হয়েছিল তাঁর। এবার তাঁর বিরুদ্ধে আরও মারাত্মক ধারা যুক্ত করল জেলা পুলিশ। বাউরি সম্প্রদায়ের এক যুবককে হেনস্থা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দুই সহযোগী প্রাক্তন জেলা তৃণমূল যুব সভাপতি গৌরব সিং ও সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার তুষার অবস্তির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর 'এসসি-এসটি অ্যাট্রোসিটি অ্যাক্ট'-এ মামলা রুজু করা হয়েছে। সদর থানায় পুরুলিয়া শহরের দীপক বাউরি অভিযোগ করেন।

উল্লেখ্য, এসসি-এসটি অ্যাট্রোসিটি অ্যাক্ট কোনো একক ধারা নয়, এটি ২৩টি ধারা নিয়ে গঠিত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিশেষ আইন। নিয়ম অনুযায়ী, একজন ডিএসপি পদমর্যাদার পুলিশ আধিকারিক এই মামলার তদন্তভার সামলাচ্ছেন।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের ২৭ মার্চ, রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায়। অভিযোগ, পুরুলিয়া শহরের মুনসেফডাঙায় তৃণমূল প্রার্থী তথা জেলা পরিষদের তদানীন্তন সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বাউরি সম্প্রদায়ের এক যুবককে গুলি করার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন গৌরব সিং এবং তুষার অবস্তি।
শুধু তাই নয়, ২০২২ সালেও গৌরব এবং তুষার ফের বাউরি সম্প্রদায়ের এক যুবকের ওপর চড়াও হন বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও সেই ঘটনায় সুজয়ের নাম ছিল না। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পুরুলিয়া শহরে বাউরি সম্প্রদায়ের এক যুবককে হেনস্থা করার অভিযোগে আবারও নাম জড়ায় সহ-সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

সোমবার রাতে এই মামলায় পুলিশ সুজয়ের দুই সহযোগী গৌরব ও তুষারকে গ্রেপ্তার করে। মঙ্গলবার আদালতে পেশ করার সময়  সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "আইনের শাসন চলছে, চুপ থাকুন।"

মঙ্গলবার প্রথমে সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে আদালতে পেশ করা হয়। তখন পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও, দুপুরের দিকে যখন গৌরব সিং ও তুষার অবস্তিকে কোর্টে আনা হয়, তখন কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয় আদালত চত্বর।  ডিম থেরাপির আশঙ্কায় পুলিশ আগে থেকেই সতর্ক ছিলো। ঢাল ও হেলমেট সহ ব্যাপক পুলিশ ফোর্স মোতায়েন ছিল কোর্ট চত্বরে। কড়া নিরাপত্তায় তড়িঘড়ি দুজনকে এজলাসে ঢোকানো হয়। আদালত তাঁদের ১ দিন জেল হাজতে রাখার নির্দেশ দেয়।

উপস্থিত জনতার ক্ষোভের মূল লক্ষ্য ছিলেন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার তুষার অবস্তি। অভিযোগ, তুষার তাঁর ফেসবুক পেজ 'পাশে আছি পুরুলিয়া' থেকে কারণে-অকারণে পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো এবং বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অনবরত বিষোদগার করে আসছিলেন। অতি-সক্রিয়তার জেরে ক্রমশ তাঁর পেজের জনপ্রিয়তা কমছিল।সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ধিক্কৃতও হচ্ছিলেন তিনি। সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ মঙ্গলবার কোর্ট চত্বরে দেখা যায়।
পুলিশের গাড়িতে ওঠার সময় ক্ষোভ উগরে প্রাক্তন যুব  জেলা তৃণমূল সভাপতি গৌরব সিং জানান, "আমরা কিছুই জানি না। এতদিন তৃণমূল করলাম।যারা টাকা কামাবার তারা কামালো, আর আমরা মিথ্যা কেস খাচ্ছি। আমাদের নামে তিন-চার বছর আগের কোনো পুরোনো মারামারির মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা সৎ আছি, আমাদের বিরুদ্ধে কোনো তোলাবাজি বা টাকা চুরির অপবাদ নেই।"

তিনি আরও জানান,  বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যেভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনা ঘটছে, তাতে এই গ্রেপ্তারির জন্য তাঁরা মানসিকভাবে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন।

এদিকে, সরকারি নথি বিকৃত করার মামলায় সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো তথা পুঞ্চা পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি কৃপাসিন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে ধরম এবং কর্মাধ্যক্ষ চরণপাহাড়ি দাসকেও এদিন আদালতে তোলা হয়। পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দ্বিতীয় দফায় ৪ দিনের কাস্টডিতে নিয়েছে। সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ৪ দিনের পুলিশ রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। 
ইতিমধ্যেই পুঞ্চা ব্লকের অতিথি আবাস, পুঞ্চা ব্লক তৃণমূল কার্যালয় এবং ধৃতদের বাড়ি থেকে বেশ কিছু অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম, একটি ল্যাপটপ এবং ব্লকের আধিকারিকের রাবার স্টাম্প বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। তবে পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতরা তদন্তে একেবারেই সহযোগিতা করছেন না।  সমস্ত ‘মিসিং লিঙ্ক’ উদ্ধার করতে ধৃতদের ম্যারাথন জেরা করতে চাইছে পুরুলিয়া জেলা পুলিশ।