সুইটি চন্দ্র▪️পুরুলিয়া:
বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম প্রতাপাদিত্য এবং মুঘল সাম্রাজ্যের সংঘাতের ইতিহাস সর্বজনবিদিত। কিন্তু সেই ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, এক মুঘল সম্রাজ্ঞীর গোপন মনস্কামনা এবং চারশো বছরের প্রাচীন এক দুর্গাপূজার গৌরবগাথা। যশোররাজ প্রতাপাদিত্যের প্রধান সেনাপতি শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই ঐতিহাসিক পূজারই এক অবিচ্ছেদ্য শাখা আজ ঐতিহ্যের আলো ছড়াচ্ছে পুরুলিয়া শহরের নীলকণ্ঠ নিবাসে।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, মুঘল সেনাপতি মান সিংহের কাছে ধুমঘাটের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বন্দী হন প্রতাপাদিত্য ও তাঁর সেনাপতি শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। দিল্লিতে বন্দী থাকাকালীন ধার্মিক ব্রাহ্মণ শঙ্করকে মহালয়ার দিন পিতৃতর্পণের অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। ক্ষোভে ও দুঃখে অনশন শুরু করেন বন্দী সেনাধ্যক্ষ। এই খবর পৌঁছায় সম্রাট আকবরের হিন্দু মহিষী তথা জাহাঙ্গীরের মাতা যোধাবাঈয়ের কানে।
উদারমনা রাজমাতার হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত যমুনার ঘাটে তর্পণের অনুমতি পান শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, গোপনে কারাগারে গিয়ে শঙ্করের সঙ্গে দেখাও করেন যোধাবাঈ। মুঘল অন্তপুরের বাসিন্দা হলেও দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মুসলিম রাজপ্রাসাদে শক্তির আরাধনা অসম্ভব জেনে, তিনি শঙ্করকে তাঁর জন্মভিটেয় গিয়ে নিজের ব্যয়ে দুর্গাপূজা করার অনুরোধ জানান। রাজমাতার মধ্যস্থতায় মুক্তি পেয়ে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে ফিরে এসে যোধাবাঈয়ের নামে সঙ্কল্প করে পূজার সূচনা করেন শৈব শঙ্কর। যা আজ শিবের কোঠার দুর্গা নামে খ্যাত।
বারাসতের সেই আদি পূজারই উত্তরপুরুষদের একটি শাখা থিতু হয় পুরুলিয়া শহরে। ব্রিটিশ ভারতের পুরুলিয়া পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান তথা বিশিষ্ট আইনজীবী স্বর্গীয় নীলকণ্ঠ চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে এই শহরে শুরু হয় এই ঐতিহাসিক পূজার অন্য এক ধারা। পরিবারের বর্তমান সদস্য রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায় এখন এই পূজার মূল দায়িত্বে। এই বাড়ির পূজা শুধু প্রাচীনই নয়, দেশাত্মবোধের ইতিহাসেও উজ্জ্বল। লোকশ্রুতি রয়েছে, স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু একবার মহাষ্টমীর পুণ্য তিথিতে এই বাড়িতে এসে দেবীর আশীর্বাদ নিয়েছিলেন।
আজও প্রতি বছর নিয়ম মেনে রথযাত্রার পুণ্য লগ্নে পুরুলিয়ার এই বনেদি বাড়িতে ঢাকের আওয়াজ আর মাঙ্গলিক আচারের মধ্য দিয়ে প্রতিমার কাঠামোয় প্রথম মাটি লাগানোর উৎসব সম্পন্ন হয়। তবে অন্য বছরের তুলনায় এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন।
পরিবারের সদস্য রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায় জানান, "নীলকণ্ঠ চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পূজো পুরুলিয়ার অত্যন্ত প্রাচীন একটি উৎসব। মায়ের প্রতিমার কাঠামোয় রথযাত্রার দিন মাটি লাগানো—এটা আমাদের প্রজন্মেও আমরা নিষ্ঠার সাথে মেনে আসছি। এই দিন মায়ের কাঠামোতে মাটি লাগানোর সাথে সাথে ঢাক বেজে ওঠে এবং আমরা পুজোর আগমনে মেতে উঠি। তবে অন্য বছর আমাদের বাড়িতে নবমীর সন্ধ্যায় বাংলার স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পীরা অনুষ্ঠান করলেও, এবার পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে আমরা দু’জন প্রিয় মানুষকে অসময়ে হারিয়েছি। তাই এবার হয়তো পুজোর জাঁকজমক অন্যবারের মতো হবে না, তবে রীতিনীতিতে কোনো খামতি থাকবে না।"
মৃৎশিল্পী রাজা সূত্রধর বলেন, "আমি আনুমানিক ২০-২২ বছর ধরে এই কাজ করছি। ছোটবেলায় বাবার সাথে এসে হাত লাগাতাম, এখন বাবা না থাকায় নিজেই দায়িত্ব সামলাই। এমনকি এখন আমার ছেলেও এই কাজে যুক্ত হয়েছে। রথযাত্রার দিন পুরুলিয়ার সমস্ত দুর্গা প্রতিমার জন্যই মাটি সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে আমি ১২টি প্রতিমা তৈরি করি। তবে নীলকণ্ঠ নিবাসের এই প্রতিমাটি একটি সাবেকি পট প্রতিমা হওয়ায়, এর পেছনে আমি একটু আলাদা গুরুত্ব আর ভালোবাসা দিয়ে কাজ করি।"
ঢাকি মোহিত দেওঘরিয়া বলেন,
"প্রতি বছর মা দুর্গার গায়ে প্রথম মাটি লাগানোর দিন থেকে আমার মনে হয় পুজো শুরু হয়ে গেল। এখানে ঢাক বাজাতে আমার ভীষণ ভালো লাগে, খুব আনন্দ হয়। অন্যান্য জায়গার চেয়ে এখানকার পুজোর পরিবেশ আমার কাছে সম্পূর্ণ আলাদা একটা অনুভূতি এনে দেয়।"
সোনা ও রৌপ্য অলংকারে ভূষিতা দেবীর এই সাবেকি রূপ দর্শনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন পুরুলিয়াবাসী। মোহিতের ঢাকের আওয়াজ আর রাজা সূত্রধরের হাতের ছোঁয়ায় নীলকণ্ঠ নিবাসে আরও একবার জীবন্ত হয়ে উঠছে পুরুলিয়া, বারাসাত আর মুঘল ইতিহাসের সেই চারশো বছরের পুরনো মেলবন্ধন।