নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
পুরুলিয়া শহরের গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সদর ক্যাম্পাস থেকে ব্লাড ব্যাংক প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে হাতোয়াড়া ক্যাম্পাসে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদে উত্তপ্ত জেলার স্বাস্থ্য পরিষেবা। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শনিবার থেকে ‘অন কল’ এবং জরুরি ভিত্তিতে রক্তের সংস্থান সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় রক্তদাতা সংগঠনগুলি। ফলে আগামী দিনে জেলাজুড়ে তীব্র রক্তের ঘাটতি এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রক্তদাতা সংগঠনগুলির তরফে পুরুলিয়া ব্লাড ওয়ারিয়র্স এর পক্ষে পার্থ চট্টরাজ, চন্দন দত্ত, পুরুলিয়া ফাউন্ডেশনের জয়দেব সিং, টিম অনেস্টের অঞ্জন ঘোষাল প্রমুখ বলেন, এতদিন জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য রক্তের জোগানের সিংহভাগ দায়িত্ব তাঁরাই পালন করতেন। তবে নতুন সিদ্ধান্তের পর সংগঠনগুলির সদস্যেরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যাঁরা অতীতে রক্ত দিয়েছেন, কেবল সেই রক্তদাতাদের পরিবারের প্রয়োজনে তাঁরা সহযোগিতা করবেন। কিন্তু হাসপাতালের সাধারণ রোগী বা কর্তৃপক্ষকে আপাতত কোনও রকম রক্তদানের সুবিধা দেওয়া হবে না। রক্তদাতা সংগঠনগুলির এই কঠোর অবস্থানের ফলে মুমূর্ষু রোগী, প্রসূতি এবং বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের জীবন সংশয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ক্ষোভ রক্তদাতা ও রোগী পরিজনদেরও।
রোগীর আত্মীয়দের দাবি, শহরের ক্যাম্পাসে ব্লাড ব্যাংক থাকার ফলে জরুরি বিভাগে ভর্তি রোগীদের দ্রুত রক্তের সংস্থান করা যেত। বিশেষ করে প্রসূতি, শিশু এবং নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হওয়া থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য স্থানটি অত্যন্ত সুবিধাজনক ছিল। তাছাড়া, শহরের ক্যাম্পাসের কাছেই রয়েছে বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশন। ফলে জেলার প্রত্যন্ত এলাকা এবং সীমান্তবর্তী ঝাড়খণ্ড থেকেও রোগী ও রক্তদাতাদের যাতায়াত ছিল সহজ। অন্যদিকে, হাতোয়াড়া ক্যাম্পাসে গণপরিবহণের সুযোগ অত্যন্ত কম। সেখানে ব্লাড ব্যাংক স্থানান্তরিত হওয়ায় রক্তদাতা এবং রোগীর পরিজনদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ জানান রোগীর আত্মীয় আসমা বিবি ও রত্না মাহাতো।
পুরুলিয়া গভর্মেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের পরিকাঠামো মূলত দুটি ক্যাম্পাসে বিভক্ত। একটি পুরুলিয়া শহরের কেন্দ্রস্থলে, অন্যটি শহর থেকে কিছুটা দূরে হাতোয়াড়ায়। শহরের কেন্দ্রস্থল অর্থাৎ সদর ক্যাম্পাসে রয়েছে জরুরি বিভাগ, প্রসূতি ও শিশু বিভাগ। এতদিন এখানেই ব্লাড ব্যাংকটি চালু ছিল। হাতোয়াড়া ক্যাম্পাসে রয়েছে বহির্বিভাগ , বিভিন্ন অস্ত্রোপচার বিভাগ এবং মেডিক্যাল কলেজের পঠনপাঠন।
ব্লাড ব্যাংক সরানোর সিদ্ধান্তের পর থেকেই সাধারণ মানুষ, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পরিবার এবং রক্তদাতা সংগঠনগুলির মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। পরিস্থিতি বিচারে 'পুরুলিয়া সদর হাসপাতাল বাঁচাও নাগরিক মঞ্চ'-এর তরফেও আন্দোলন শুরু হয়েছে। শনিবার স্বাস্থ্য দফতরে একটি ডেপুটেশন জমা দেন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
নাগরিক মঞ্চের প্রতিনিধি ডা. অসীম সিনহার বলেন, "হাসপাতালের শহর ক্যাম্পাসকে পূর্ণাঙ্গ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হোক এবং হাতোয়াড়ায় চাল রাখা হোক মূল মেডিক্যাল কলেজ।"
একই সুর শোনা গেছে পুরুলিয়া ফাউন্ডেশনের সম্পাদক জয়দেব সিং, ‘টিম অনেস্ট’-এর অঞ্জন ঘোষাল এবং ‘পুরুলিয়া ব্লাড ওয়ারিয়ার্স’-এর সদস্য চন্দন দত্ত ও পার্থ চট্টরাজের গলায়। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, "জনস্বার্থ এবং রোগীদের জীবনের কথা বিবেচনা করে ব্লাড ব্যাংকটি দ্রুত শহর ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনা উচিত"।
রক্তদাতা সংগঠনগুলির কর্মবিরতির সিদ্ধান্তে বর্তমানে চরম জটিল আকার ধারণ করেছে পুরুলিয়ার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। এখন জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কি ব্লাড ব্যাংক পুনর্নবীকরণ করে শহরের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনবে, নাকি জরুরি রক্তের জোগান স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প কোনো পথ খুঁজবে সেই উত্তরের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন ভুক্তভোগী রোগী ও তাঁদের উদ্বিগ্ন পরিজনেরা।