শুভদীপ মাহাত, পুরুলিয়া:
২০০৪ সালে নিজের গ্রন্থ 'রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি'-র জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিলেন ঐতিহাসিক সুমিত সরকার। কিন্তু ২০০৭ সালে রাজ্য সরকারের জমি অধিগ্রহণ নীতির প্রতিবাদে সেই পুরস্কারই নিজে হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। পুরস্কারের হাতছানি এড়ানো সহজ নয়, তবু নিজের আদর্শে অবিচল থেকেছিলেন সমাজের নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চায় অগ্রণী সুমিত সরকার। মঙ্গলবার পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত হলো তাঁর স্মরণসভা।
ইতিহাস বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক ড. গুরুদাস মন্ডল, বিভাগীয় প্রধান ড. নন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফেসর গৌতম মুখোপাধ্যায়, প্রফেসর মনোশান্ত বিশ্বাস, ড. পলাশ মন্ডল, ড. শুভঙ্কর দে ও ড. নাজু হাঁসদা-সহ বিভিন্ন বিভাগ ও কলেজের শিক্ষক, গবেষক এবং পড়ুয়ারা।
আলোচনায় বলা হয়, "পুরস্কারের প্রতি টান থাকাই স্বাভাবিক, কেউ কেউ তো তার জন্য জীবনও উৎসর্গ করেন। কিন্তু সুমিত সরকার ছিলেন একেবারে ভিন্ন ধাতুতে গড়া মানুষ। তৎকালীন রাজ্য সরকারের জমি অধিগ্রহণ নীতি কৃষকের বিপক্ষে ও শিল্পের পক্ষে যাওয়ায়, তার প্রতিবাদেই পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।"
এই বিষয়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, "আমরা ইতিহাস কেন পড়ব, কী পড়ব, কী জন্যে পড়ব এবং এই যে নিম্নবর্গের ইতিহাস- গণইতিহাসের বিষয়টি পড়ার যৌক্তিকতা কী? সুমিত সরকার সেটি আমাদেরকে সুচারু রূপে অনুধাবন করতে সাহায্য করেছেন। মাত্র দুই পক্ষকাল আগে তিনি মারা গেছেন। আমরা সিধো কানু বিরসা বিশ্ববিদ্যালয় পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যারা তাঁর স্মরণসভার আয়োজনটি করছি।"
আলোচনায় উঠে আসে ঐতিহাসিক ই. এইচ. কারের কথাও। তার 'হোয়াট ইজ হিস্ট্রি' গ্রন্থের বিখ্যাত 'মাছওয়ালা উপমা'র সূত্র ধরে বক্তারা বলেন, সুমিত সরকারের পরিচয়কেও কোনো একটি মতবাদে বেঁধে ফেলা যায় না। তিনি আমাদের বুঝতে শিখিয়েছেন, ভাবতে শিখিয়েছেন এবং ইতিহাসের পথ ধরে মানব সমাজের আগামী যাত্রায় শামিল হওয়ার দিশা দেখিয়ে গিয়েছেন।
এই কর্মসূচি নিয়ে ড. শুভঙ্কর দে বলেন, "আমাদের আজকের আলোচনা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুধা বিভক্ত ছিল এবং সেই আলোচনায় উঠে এসেছে যে, সুমিত সরকার কীভাবে আমাদের ঐতিহাসিক তত্ত্বকে তুলে ধরেছেন, কীভাবে বিকল্প ইতিহাস সন্ধান করেছেন, ইতিহাসের আকরকে, তত্ত্বকে ঠিক কীভাবে ব্যবহার করা উচিত, সেই সম্পর্কে নানান কথাবার্তা আমাদের আজকের আলোচনায় উঠে এসেছে। "
উঠে আসে সুমিত সরকারের শিক্ষকতা জীবনের কথাও। প্রথমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন তিনি, এরপর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার পদে কাজ করেন, যা বর্তমানে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর পদের সমতুল্য। পরে দিল্লি, জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশের একাধিক প্রতিষ্ঠানেও পড়িয়েছেন তিনি।
কেউ কেউ তাকে 'মার্কসবাদী ঐতিহাসিক' বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, স্মরণসভায় বলা হয়, মানুষের মুক্তির কথা বলা প্রতিটি দার্শনিকই শেষ পর্যন্ত মার্কসবাদে এসে মেশে, কারণ মার্কসের মূল তত্ত্বের সারকথাই লুকিয়ে আছে এই 'আমরা সকলে'র ভাবনায়। সুমিত সরকারের ইতিহাস-দর্শনও এই ভাবনার সঙ্গেই মিশে আছে। আর এখানেই তাঁর নিজস্বতা, এখানেই তিনি দল-মতের ঊর্ধ্বে।
ইতিহাস বিভাগের গবেষক সৌমেন মিশ্র বলেন, "নতুন প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সুমিত সরকারের লেখা ইতিহাস ও কাজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি কোনো পক্ষ না নিয়ে ইতিহাস চর্চা করেছেন এবং তার লেখা পড়েই ছাত্র-ছাত্রীরা ইতিহাসকে ভালোবাসতে শিখেছে। সাল-তারিখের বাইরেও ইতিহাসের মধ্যে যে একটা রস বা রহস্য আছে, সেই শিক্ষা সুমিত সরকার দিয়েছেন"।
সভার শেষে বলা হয়, যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে তিনি একদা শিক্ষকতা করেছেন, ব্যস্ততার ভিড়ে তারা হয়তো তাকে ভুলে গিয়েছে। কিন্তু পুরুলিয়া তাঁকে ভোলেনি, ভুলতে পারে না, আগামী প্রজন্মকেও তাকে ভুলতে দেওয়া হবে না।