ব্লক আমার জন্মভূমি

যে গ্রামের বুক কেটে গড়ে উঠছে পুরুলিয়ার একের পর এক আবাস

পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে কংসাবতী নদী। সেই নদীর ধারেই কয়েকশো বছর আগে গড়ে উঠেছিল আজকের কাটাবেড়া।
যে গ্রামের বুক কেটে গড়ে উঠছে পুরুলিয়ার একের পর এক আবাস

দেবীলাল মাহাতো


কয়েকশো বছর আগে জঙ্গল ও নদীকে আশ্রয় করেই গড়ে উঠেছিল এক একটি জনপদ। প্রতিটি জনপদের জন্মের কথা লেখা থাকে তার ইতিহাসে। গাছ-গাছালি, মানুষ ও নদীকে আশ্রয় করে জড়িয়ে থাকা সেই সব গল্পই বলে দেয় এক একটি গ্রাম গড়ে ওঠার আসল কাহিনী। সেই গল্প নিয়েই আজও দাঁড়িয়ে আছে পুরুলিয়া ১ নম্বর ব্লকের কাটাবেড়া গ্রাম।

গ্রামের কাছে নদীর বর্তমান রূপ।

পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে কংসাবতী নদী। সেই নদীর ধারেই কয়েকশো বছর আগে গড়ে উঠেছিল আজকের কাটাবেড়া। পুরুলিয়া -রাঁচি রাজ্যসড়কের অন্যতম ব্যস্ত জনপদ চাষমোড়  থেকে কাটাবেড়ার দূরত্ব ৫কিমি। জঙ্গলের কাঠ আর নদীর জলই ছিল গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার প্রথম অবলম্বন। ধীরে ধীরে গ্রামের পরিবেশ অনেকটাই বদলেছে। একসময় এলাকায় ছিল শালগাছের ঘন জঙ্গল, পরে সেই জায়গা দখল করে পলাশ গাছ। বর্তমানে সেই জায়গায় রয়েছে বাবলা গাছের সারি। প্রকৃতির এই বিবর্তনের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে গ্রামটি।

গ্রামের কংসাবতী নদীতে এই ভাবেই চলে যাতায়াত।

গ্রামের বয়স্কদের মুখে এখনও শোনা যায় সেই পুরনো দিনের কথা।  কৃষি নির্ভর গ্রামটিকে সবাই একসময় চিনত ডালশস্যের গ্রাম হিসাবে। এখানকার জমি ডালশস্য চাষের উপযোগী। বিঘার পর বিঘা জমিতে উৎপাদন হত ছোলা, খেসারি,অড়হর, ভুট্টা।  নিজেদের চাহিদা, আত্মীয়-স্বজনের চাহিদা মেটানোর পর সেই ডালশস্য বিক্রি করে অর্থ উপার্জনও করতেন গ্রামবাসীরা। গ্রামবাসীরা জানান, গ্রামের মাটির বাড়িতে থাকতো কোঠার চালা। সেই কোঠাতে ভুট্টা টাঙিয়ে রাখা হতো। আর হতো লাক্ষা চাষ। পলাশ গাছে লাক্ষা চাষ করে ভালোই আয় তো গ্রামবাসীদের । তবে বর্তমানে লাক্ষা চাষের কদর নেই। বর্তমানে গ্রামবাসীরা ঝুঁকেছেন বেগুন চাষে। জমিতে ধান কাটার পরেই শুরু হয় বেগুন গাছ লাগানোর তোড়জোড়। তারপরেই গ্রামের রাস্তা ধরে বেগুন যায় বাজারের পথে । বিগত কয়েক বছর ধরে কাটাবেড়া গ্রামের এটাই চেনা ছবি।

 

গ্রামের নামকরণ কেন কাটাবেড়া হল, সেই সম্পর্কে স্পষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারলেন না। তবে এ নিয়ে গ্রামে প্রচলিত রয়েছে তিনটি ভিন্ন মত। গ্রামের একাংশের মতে, গ্রামের তিন দিকে তিনটি খাল বেড়া হিসেবে এই গ্রামকে ঘিরে রেখেছিল। সেই থেকেই গ্রামের নাম হয় কাটাবেড়া।আবার কারও মতে, একসময় এই এলাকায় বাবলা জাতীয় কাঁটা গাছের আধিক্য ছিল। কাঁটা গাছ থাকায় গ্রামের নামকরণ হয়েছে কাটাবেড়া। অন্য একটি মতও শোনা যায় গ্রামে। গ্রামের পূর্বপুরুষরা আগে গাড়াফুসড়ো গ্রামে বসবাস করতেন। পরে তাঁরা এই এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। গাড়াফুসড়ো মৌজা কেটেই নাকি কাটাবেড়া মৌজা হয়েছিল। সেই কারণেই গ্রামের নামকরণ হয় কাটাবেড়া। কোনটি সঠিক, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই গল্পগুলোই আজও কাটাবেড়া গ্রামের ইতিহাসকে জীবন্ত করে রেখেছে।

তিনটি গুষ্টি সম্প্রদায় মানুষদের নিয়ে শুরু হয়েছিল গ্রামের পথচলা। এখন গ্রামে চারটি পাড়ায় মাহাতো ,কর্মকার,রায়(ভুঁইয়া), সর্দার,রাজোয়াড় , কালিন্দী সম্প্রদায় মানুষের বসবাস। বর্তমানে গ্রামে ভোটার সংখ্যা ৮০০।  গ্রামে রয়েছে একটি প্রাথমিক স্কুল। সেই স্কুলেই ভোটগ্রহণ কেন্দ্র হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য রয়েছে একটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র। নিজস্ব ভবন না থাকায় ভাড়া করা ঘরেই চলে কাজকর্ম। রয়েছে দুটি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। সেই কেন্দ্রগুলিতেও ভবন নেই। গ্রামে রয়েছে একটি শিবমন্দির।

গ্রামেরহরি মন্দির।

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, একসময় গ্রামের মানুষের যাতায়াত ছিল খুবই কষ্টসাধ্য। কাঁচা মাটির রাস্তা, বর্ষায় কাদায় চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যেত। তবে এখন সেই কষ্ট আর নেই। সময়ের সাথে সেই রাস্তা এখন পাকা হয়েছে। পাকা হলেও বাসিন্দাদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বালি বোঝাই ট্রাক্টরের যাতায়াত। দিন-রাত ধরে একের পর এক ট্রাক্টর গ্রামের বুক চিরে যাতায়াত করছে। বাচ্চাদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটে গ্রামবাসীদের। তাঁদের আক্ষেপ, যে নদী একদিন মানুষকে বাঁচার জন্য জল দান করেছিল, বসতি গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল, সেই নদী আজ বিপন্ন। হাজার হাজার ট্রাক্টর নদীর বুক চিরে নিয়ে যাচ্ছে বালি। এই গ্রামের বুক কেটে গড়ে উঠছে পুরুলিয়ার একের পর এক আবাস। বিপন্ন হয়ে পড়ছে বাস্তুতন্ত্র। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কংসাবতী নদীতে সেতুর কাজও অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীদের।

▪️▪️▪️

হরিপদ মাহাতো
গ্রামের বাসিন্দা

আমার জন্ম এই গ্রামেই। এই মাটিতেই বড় হয়ে ওঠা। কৃষি নির্ভর এই গ্রামকে সবাই একসময় চিনত ডালশস্যের গ্রাম হিসাবে। এখানকার জমি ডালশস্য চাষেরই উপযোগী। মনে পড়ে, বিঘার পর বিঘা জমিতে উৎপাদন হত বুট, খেসারি, রাহেড়, ভুট্টা। সেই ডালশস্য নিজেদের চাহিদা, আত্মীয়-স্বজনের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি হাটে বিক্রি করেও ভাল অর্থ উপার্জন হত। তখন গ্রামের প্রায় সব বাড়িই ছিল মাটির। বাড়িতে থাকত কোঠার চালা। সেই কোঠাতে আমরা ভুট্টা টাঙিয়ে রাখতাম সারা বছরের জন্য। ধান, ডালের পাশাপাশি আর একটা বড় ভরসা ছিল লাক্ষা চাষ। পলাশ গাছে লাক্ষা চাষ করে ভালই আয় হত আমাদের। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। বর্তমানে লাক্ষা চাষের কদর প্রায় নেই বললেই চলে। প্রশাসন যদি একটু সহযোগিতা করে, প্রশিক্ষণ ও বাজার তৈরিতে সাহায্য করে, তাহলে আবার এলাকায় ফিরতে পারে লাক্ষা চাষের সেই সোনালি দিন।

▪️▪️▪️

 


মধুসূদন মাহাতো 
গ্রামের বাসিন্দা

আজ থেকে ৩০ বছর আগে গ্রামটির রাস্তাঘাট খুবই খারাপ ছিল। চিটামাটি আর কাদার জন্য বর্ষাকালে রাস্তায় হাঁটা ও গাড়ি চলাচলের অযোগ্য হয়ে উঠত। । এখন রাস্তাঘাট খুবই ভালো হয়েছে। এখন গ্রামটির পরিবেশ ভাল লাগে। কংসাবতী নদী ও পলাশবন গ্রামটির অন্যতম আকর্ষণ। তবে গ্রামে একটি খেলার মাঠ থাকলে আরও ভালো হয়।
বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা, দেবদেবীর ভর, অলৌকিক অন্ধবিশ্বাস, শব্দদূষণ-সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সচেতনতার সময়ে গ্রামের মানুষকে পাশে পায়।

▪️▪️▪️