শহর

পুরুলিয়া আদালতে নিজের মামলায় 'উকিল' নিজেই হলেন 'মাওবাদী' নেতা!

পুলিশ সূত্রে খবর, ২০১০ সালের ২৭ জুন বাঘমুন্ডির অযোধ্যা মোড়ে ফরওয়ার্ড ব্লক লোকাল কমিটির সম্পাদক সূর্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে সোনাকে খুন করা হয়েছিল। সেই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অভিযুক্ত কানুরামকে এ দিন আদালতে তোলা হয়। দীর্ঘ দিন ঝাড়খণ্ডে আত্মসমর্পণকারী মাওবাদী হিসেবে পুনর্বাসনের আওতায় থাকলেও ওই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া এখনও চলছে।
পুরুলিয়া আদালতে নিজের মামলায়  'উকিল' নিজেই হলেন 'মাওবাদী' নেতা!

 


সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:

এক সময় যে মাও নেতার নাম শুনলেই আতঙ্ক ছড়াতো জঙ্গলমহলে, বুধবার পুরুলিয়া জেলা আদালতের চত্বরে দাঁড়িয়ে তিনিই প্রশ্ন তুললেন সশস্ত্র আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে। ঝাড়খণ্ডের আত্মসমর্পণকারী মাওবাদী নেতা কানুরাম মুন্ডা ওরফে অর্জুন মুন্ডার মুখে এমন মন্তব্য শুনে বিস্মিত আদালত চত্বরের অনেকে।

পুলিশ সূত্রে খবর, ২০১০ সালের ২৭ জুন বাঘমুন্ডির অযোধ্যা মোড়ে ফরওয়ার্ড ব্লক লোকাল কমিটির সম্পাদক সূর্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে সোনাকে খুন করা হয়েছিল। সেই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অভিযুক্ত কানুরামকে এ দিন আদালতে তোলা হয়। দীর্ঘ দিন ঝাড়খণ্ডে আত্মসমর্পণকারী মাওবাদী হিসেবে পুনর্বাসনের আওতায় থাকলেও ওই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া এখনও চলছে।

এ দিন আদালতে তাঁর কোনও আইনজীবী ছিলেন না। নিয়ম অনুযায়ী, অভিযুক্তের আইনজীবী না থাকলে জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের তরফে আইনজীবী দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু লোক আদালত-সংক্রান্ত একটি বিরোধকে কেন্দ্র করে পুরুলিয়া বার অ্যাসোসিয়েশন চলতি মাসের ১৬ তারিখ থেকে জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ এবং জেলা বিচারকের এজলাস বয়কট করায় সেই সুযোগও মেলেনি। ফলে নিজের হয়ে নিজেকেই সওয়াল করতে হয় প্রাক্তন মাওবাদী নেতাকে। আদালতে হলফনামা জমা দেন তিনি। অন্যান্য অভিযুক্তদের এজলাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর মুখ্য বিচারবিভাগীয় বিচারক তাঁর সঙ্গে পৃথক ভাবে কথা বলেন। বিচারক জানতে চান তিনি বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন কি না। উত্তরে কানুরাম জানান, বাংলা-সহ একাধিক ভাষায় তিনি সাবলীল।

এক সময়ে সিপিআই মাওবাদী সংগঠনের বাংলা- ঝাড়খণ্ড - ওড়িশা সীমান্ত আঞ্চলিক কমিটির সদস্য ছিলেন কানুরাম। আদালতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে ১৪ দিনের হেফাজতে চাওয়া হলে বিচারক ১০ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন।
আদালত চত্বর থেকে বেরিয়ে এসে কানুরাম সম্প্রতি আত্মসমর্পণকারী মাওবাদী নেত্রী শকুন্তলা মাহাতো ওরফে পুষ্পা মাহাতোর সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানান। আত্মসমর্পণকারী মাওবাদী কানুরাম মুন্ডা ওরফে অর্জুন মুন্ডা বলেন,
"এখন সশস্ত্র আন্দোলন করার কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই। তাই যারা এখনও জঙ্গল জীবনে লড়াই করছেন তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছি। সম্প্রতি শকুন্তলা মাহাতো ওরফে পুষ্পা মাহাতোর আত্মসমর্পণকে  স্বাগত জানাই"।

ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার ঘাটশিলা থানার জিয়ানকোচা গ্রামের বাসিন্দা কানুরাম ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি  পূর্ব সিংভূমের তৎকালীন পুলিশ সুপার অমিত টি ম্যাথুর কাছে অস্ত্র-সহ আত্মসমর্পণ করেন। এরপর থেকে ঝাড়খণ্ড সরকারের পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় হাজারিবাগের একটি সেফ হাউসে থাকছিলেন তিনি। ঝাড়খণ্ডের আত্মসমর্পণ নীতি অনুযায়ী, আত্মসমর্পণকারী মাওবাদীদের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলায় হাজিরা দেওয়া বাধ্যতামূলক। গত প্রায় নয় বছরে বিভিন্ন মামলায় হাজিরা দিয়ে একে একে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেকসুর খালাস পেয়েছেন কানুরাম। তবে বাঘমুন্ডির ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা খুনের মামলাটি এখনও বিচারাধীন। সোমবার ঘাটশিলা থেকে তাঁকে পুরুলিয়া জেলা সংশোধনাগারে আনা হয়। বুধবার সেই মামলাতেই আদালতে হাজির করা হলে, আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি তাঁর মন্তব্য নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে জঙ্গলমহলের এক সময়ের সশস্ত্র আন্দোলনের অধ্যায়কে।