সাধারণ খবর ব্লক শহর

মঙ্গলবার থেকে নম্বর প্লেট ছাড়া টোটো নয় পুরুলিয়ায়, নির্দিষ্ট হবে চলাচলের এলাকাও, জানালেন এসপি

সোমবার পথ নিরাপত্তা সপ্তাহের প্রথম দিনে বলরামপুরে নতুন ট্রাফিক গার্ড এবং পুরুলিয়া জেলা ট্রাফিকের হেড কোয়ার্টারে নতুন ব্যারাকের উদ্বোধন করে এমনই একগুচ্ছ পদক্ষেপের কথা জানালেন পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার কুমার শানি রাজ।
মঙ্গলবার থেকে নম্বর প্লেট ছাড়া টোটো নয় পুরুলিয়ায়, নির্দিষ্ট হবে চলাচলের এলাকাও, জানালেন এসপি

 

সুইটি চন্দ্র , পুরুলিয়া ও বলরামপুর :

মঙ্গলবার থেকে পুরুলিয়া শহরের রাস্তায় নম্বর প্লেট ছাড়া কোনও টোটো চলতে দেওয়া হবে না। শুধু তা-ই নয়, শহরে টোটোর দাপট কমাতে তাদের চলাচলের এলাকা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার পরিকল্পনাও করেছে জেলা পুলিশ। সোমবার পথ নিরাপত্তা সপ্তাহের প্রথম দিনে বলরামপুরে নতুন ট্রাফিক গার্ড এবং পুরুলিয়া জেলা ট্রাফিকের হেড কোয়ার্টারে নতুন ব্যারাকের উদ্বোধন করে এমনই একগুচ্ছ পদক্ষেপের কথা জানালেন পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার কুমার শানি রাজ।

পুলিশ সূত্রে খবর, টোটো নিয়ন্ত্রণে অভিযানে আঞ্চলিক পরিবহণ কর্তৃপক্ষও থাকবে। পুলিশ তাদের সহযোগিতা করবে। প্রথম ধাপে নম্বর প্লেটহীন টোটোর বিরুদ্ধে অভিযান হবে। তার পরে শহরের বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে নির্দিষ্ট টোটোকে নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আইন মেনে ধাপে ধাপে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।

শহরের যানজটের পাশাপাশি রাস্তায় গবাদি পশু ঘুরে বেড়ানোর সমস্যাও পুলিশের নজরে এসেছে। পুরসভা এলাকায় যত্রতত্র দাবিদারহীন গরু ঘোরাফেরা করায় যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে বলে পুলিশ কর্তাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। এ বিষয়ে পুরসভার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

পথ নিরাপত্তা সপ্তাহের প্রথম দিনেই ১৮ নম্বর জাতীয় সড়কে পুরুলিয়া থেকে বলরামপুরে প্রবেশের মুখে বলরামপুর-আড়শা নতুন ট্রাফিক গার্ডের উদ্বোধন হয়। সম্প্রতি ওই এলাকায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ট্রাফিক নজরদারি আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয় জেলা পুলিশ। নতুন ট্রাফিক গার্ড চালু হওয়ায় দুর্ঘটনা কমবে বলে পুলিশের আশা।

নতুন ট্রাফিক গার্ড চালু হওয়ায় জেলায় ট্রাফিক গার্ডের সংখ্যা বেড়ে হল পাঁচ। বলরামপুরে পুলিশ আধিকারিক, কনস্টেবল, এনভিএফ এবং সিভিক ভলান্টিয়ার মিলিয়ে প্রায় ১১০ জনকে মোতায়েন করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে ১২-১৩ জন কনস্টেবল ও হোমগার্ড রয়েছেন। সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার এক আধিকারিককে ট্রাফিক গার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েক জন সাব-ইন্সপেক্টরকেও সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে।

সোমবারই পুরুলিয়া শহরে জেলা ট্রাফিক হেড কোয়ার্টারের নতুন ব্যারাকের উদ্বোধন করা হয়। এত দিন ট্রাফিক পুলিশের থাকার পরিকাঠামো যথেষ্ট দুর্বল ছিল। নতুন ব্যারাক চালু হওয়ায় ট্রাফিক কর্মীদের থাকার সমস্যা অনেকটাই মিটবে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

বলরামপুরে ট্রাফিক গার্ড উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার (অপারেশন) বিদ্যাগর আঞ্জিকা অনন্ত। জেলা ট্রাফিক হেড কোয়ার্টারের ব্যারাক উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে ছিলেন পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার (সদর) ধীরাজ ঠাকুর। দু’টি অনুষ্ঠানেই উপস্থিত ছিলেন পুরুলিয়া জেলা পুলিশের ডিএসপি ট্রাফিক অরিন্দম চক্রবর্তী।

পুলিশ সুপার কুমার শানি রাজ বলেন, 
"পুরুলিয়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে আমরা একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আজ (সোমবার) দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে। বলরামপুরে নতুন করে ট্রাফিক গার্ড চালু হয়েছে। পাশাপাশি পুরুলিয়া শহরে প্রথম বার ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল ব্যারাকও উদ্বোধন করা হল। গত কয়েক দিন ধরে জাতীয় সড়কে বলরামপুর এলাকায় দুর্ঘটনা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। সেই কারণেই সেখানে নতুন ট্রাফিক গার্ড চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে হাতোয়াড়া, হুড়া এবং রঘুনাথপুরে তিনটি ট্রাফিক গার্ড চালু করেছি। আজ বলরামপুরে চতুর্থ ট্রাফিক গার্ড চালু হল। সদর ট্রাফিক গার্ড অবশ্য আগে থেকেই রয়েছে। অর্থাৎ গত দু’মাসে জেলায় চারটি নতুন ট্রাফিক গার্ড চালু করা হয়েছে। আমরা দেখেছি, ওই তিনটি এলাকায় ট্রাফিক গার্ড চালু হওয়ার পর দুর্ঘটনা প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু ওই এলাকাগুলিতে দুর্ঘটনা কমার পরে বলরামপুরের দিকে দুর্ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। তাই সেখানে ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছি।

বলরামপুরে ট্রাফিক গার্ডের জন্য জায়গা চিহ্নিত করে সিসিটিভি এবং পুলিশকর্মীদের থাকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে ১১০ জনেরও বেশি কর্মী মোতায়েন করেছি। এর মধ্যে ১০০-র বেশি সিভিক ভলান্টিয়ার, প্রায় ১২-১৩ জন কনস্টেবল ও হোমগার্ড রয়েছেন। পাশাপাশি তিন-চার জন ডেডিকেটেড কর্মী এবং সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার এক আধিকারিককে ট্রাফিক গার্ডের ওসি হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আজ পুরো টিমকে ব্রিফ করে আমরা কাজ শুরু করেছি।

পুরুলিয়া শহরে এত দিন যে ব্যারাকটি ছিল, সেটির অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাই ট্রাফিক পুলিশের জন্য নতুন করে ব্যারাকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিএসপি ট্রাফিক, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর এবং অতিরিক্ত সাব-ইন্সপেক্টর-সহ পুরো টিমকে নিয়ে আমরা ট্রাফিকের যে বিষয়গুলি এখন আমাদের প্রধান উদ্বেগ, সেগুলির উপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।

আজ থেকে ট্রাফিক সপ্তাহও শুরু হচ্ছে। ৩ থেকে ৯ অগস্ট পর্যন্ত ট্রাফিক সপ্তাহ চলবে। এই সময়ে বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক সচেতনতামূলক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মসূচি নেওয়া হবে। এর জন্য জেলার আকার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। সেই অর্থ ব্যবহার করে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে আরও বেশ কিছু কাজ করা হবে।

দুর্ঘটনা কমাতে আমরা স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করছি। কয়েকটি স্থানীয় সংস্থার সঙ্গে কথা বলে প্রায় ৯০টি গার্ডরেল পেয়েছি। জাতীয় সড়কের বিভিন্ন জায়গায় আলো লাগানো এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন স্তরের মানুষজনের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কোথায় বেশি দুর্ঘটনা হচ্ছে, সেই জায়গাগুলিকে চিহ্নিত করে সেখানে আলো, গার্ডরেল এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রাফিক কর্মী মোতায়েনের উপর আমরা জোর দিচ্ছি। কোথায় কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব, সেটাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণেও একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। কয়েকটি রাস্তায় সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত টোটোর জন্য ওয়ান-ওয়ে ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আগামী দিন থেকে নম্বর প্লেট ছাড়া কোনও টোটো চলতে দেওয়া হবে না। এটি আমাদের দ্বিতীয় ধাপের পদক্ষেপ। এর পরেও যদি নম্বর প্লেট ছাড়া টোটো চলাচল করে, তা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ওই টোটোগুলিকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এই অভিযানে আরটিও এবং এআরটিও-র আধিকারিকেরাও আমাদের সঙ্গে থাকবেন।

পরবর্তী পর্যায়ে টোটো চলাচলের এলাকা ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ কোন টোটো কোন এলাকায় চলাচল করতে পারবে, সেই বিষয়টি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে। শহরের কিছু এলাকায় পার্কিংয়ের সমস্যা বেশি। শহরের বর্তমান পরিকল্পনা ও ট্রাফিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেই সব জায়গায় প্রয়োজন অনুযায়ী ওয়ান-ওয়ে ব্যবস্থা চালু করার কথাও ভাবছি।

কোর্ট মোড় থেকে পোস্ট অফিসের দিকে রাস্তার পাশে যে বেআইনি দখল ছিল, তার অনেকটাই আমরা সরিয়েছি। আগামী দিনে আরও কিছু ট্রাফিক পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আমাদের লক্ষ্য হল, যাতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত আরও স্বাভাবিক ও মসৃণ হয় এবং যানজট কমানো যায়।

শহরের রাস্তায় গবাদি পশু ঘোরাফেরা করার বিষয়টিও আমাদের নজরে রয়েছে। পুরসভা ও প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলব। এসডিও নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে এবং জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেখানে বেআইনি ভাবে কিছু রয়েছে এবং তার ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থায় সমস্যা হচ্ছে, সেখানে আইন মেনে সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে তা সরানোর ব্যবস্থা করা হবে। বরাবাজার থানার পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

স্কুল ও কলেজের সামনে নির্দিষ্ট সময়ে যানজটের বিষয়টিও আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের সামনে সিভিক ভলান্টিয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনও স্কুলের সামনে সমস্যা বেশি হলে আমাদের জানালে সেখানে অতিরিক্ত কর্মী দেওয়া হবে।

ট্রাফিক ব্যবস্থায় আমরা আরও বেশি ডেডিকেটেড কর্মী দিচ্ছি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ১০ কিলোমিটার রাস্তার দায়িত্বে প্রায় ৫০ জন সিভিক ভলান্টিয়ার রাখা হচ্ছে। তাঁদের মূল দায়িত্বই হল ওই এলাকায় দুর্ঘটনা না ঘটতে দেওয়া এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখা। ধীরে ধীরে ট্রাফিক ব্যবস্থার উপর আরও বেশি নজর দিয়ে আমরা পরিস্থিতির উন্নতি করার চেষ্টা করছি। দুর্ঘটনা কমানো, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।"