শিক্ষা ব্লক

পা দিয়ে লিখে সমাজ গড়ছেন বাঘমুন্ডির শিক্ষক জগন্নাথ মাহাতো

ঠুটো জগন্নাথ বোঝাতেই হয়ত এমন নাম! কিন্তু হাত না থাকা সত্ত্বেও নিজের অদম্য জেদে সেই নামকে তিনি মিথ্যে প্রমাণ করেছেন। আজ দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বাঁ পায়ের দুই আঙুলের ফাঁকে মার্কার পেন গুঁজে ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক কষে প্রাথমিক পাঠ দিচ্ছেন ছাত্র-ছাত্রীদের। ছবি এঁকে বোঝাচ্ছেন পরিবেশ বিজ্ঞানের কথা।
পা দিয়ে লিখে সমাজ গড়ছেন বাঘমুন্ডির শিক্ষক জগন্নাথ মাহাতো

 


সুইটি চন্দ্র, বাঘমুন্ডি:

ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। কিন্তু সেই ইচ্ছে যদি সমস্ত শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে চুরমার করে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছায়?  তবে তা শুধু অনুপ্রেরণা নয়, এক রূপকথার গল্প হয়ে ওঠে। এমনই এক রূপকথার বাস্তব রূপ পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি ব্লকের বুড়দা গ্রামের ৪১ বছর বয়সী প্রাথমিক শিক্ষক জগন্নাথ মাহাতো। জন্ম থেকেই তাঁর দুটো হাত নেই। ঠাকুরদা  নাম দিয়েছিলেন জগন্নাথ।

ঠুটো জগন্নাথ বোঝাতেই হয়ত এমন নাম! কিন্তু হাত না থাকা সত্ত্বেও নিজের অদম্য জেদে সেই নামকে তিনি মিথ্যে প্রমাণ করেছেন। আজ দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বাঁ পায়ের দুই আঙুলের ফাঁকে মার্কার পেন গুঁজে ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক কষে প্রাথমিক পাঠ দিচ্ছেন ছাত্র-ছাত্রীদের। ছবি এঁকে বোঝাচ্ছেন পরিবেশ বিজ্ঞানের কথা।

বুড়দা-কালিমাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের ডাভা-তোড়াং নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণীর খুদে পড়ুয়াদের কাছে তিনি শুধু শিক্ষক নন। এক জীবনযুদ্ধের জ্বলন্ত উদাহরণ।
ছেলেবেলায় দিদিরা যখন পড়তে বসতেন। তখন জগন্নাথও বসতেন পাশে। যখন দেখতেন তাঁর দিদিরা কলম দিয়ে খাতায় লিখছেন, তখন থেকেই তাঁর মনে জেদ চাপে। একদিন বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল ও তার পাশের আঙুলের মাঝে কলম চেপে ধরে লেখার চেষ্টা করেন। সেটাই যেন তার হাতেখড়ি হয়। থুড়ি পা-খড়ি। ওই ভাবেই লেখেন অ-আ, ক-খ।

বাঘমুন্ডি ডাভা-তোড়াং নিম্নবুনিয়াদি বিদ্যালয়ের শিক্ষক জগন্নাথ মাহাতো বলেন, "পায়ে ভর করেই পার করেই আমার হাতেখড়ি। বুড়দা বিবেকানন্দ শিশু মন্দির ও বুড়দা হাইস্কুল পার হয়ে ঝালদা সত্যভামা বিদ্যাপীঠ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং পুরুলিয়া শহরের জে কে কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি। এরপর বিধাননগরে মৎস্য দপ্তরে সরকারি চাকরি পেলেও, জন্মভূমির প্রতি টান ও শিক্ষকতার স্বপ্নের খাতিরে তা ছেড়ে দিই। ২০১২ সালের টেট  পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করে ২০১৪ সালে নিজ এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদে যোগ দিলাম।"

চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী শেফালী মাছুয়ার জানায়, "স্যার খুবই ভালো ভাবে পড়ান , পড়া বুঝতে না পারলে  বুঝিয়ে দেন মাস্টারমশাই"।

জগন্নাথ প্রমাণ করে দিয়েছেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোন বাধা নয়। ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে না।   খুদে পড়ুয়াদের কাছে তিনি শুধু শিক্ষক নন, জীবনের বড় পাঠ শেখানোর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।