
সুজয় দত্ত
কিছুটা দূরে ঘোর কালো পাহাড়। আর তাকে ছুঁয়ে উড়তে থাকা গাভীর মতো মেঘ। না বৃষ্টি এখানে বারোমাস হয় না ঠিকই কিন্তু বৃষ্টিই জয়পুর বিধানসভার ঝালদা ২ নং ব্লকের চিতমু অঞ্চলের এই খটঙ্গা গ্রামকে করেছে পৃথিবী বিখ্যাত।
সে বৃষ্টি একেবারে অন্যধরনের। অস্ত্র বর্ষণ।
শীতের রাত। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত এক গ্রাম। চারদিকে ঘুমন্ত নিস্তব্ধতা। হঠাৎই বিকট এক শব্দে কেঁপে উঠল গোটা এলাকা। কেউ বুঝতেই পারলেন না, কী ঘটে গেল মাথার উপর দিয়ে। রাত পোহাতেই বদলে গেল গ্রামের চেনা ছবি। ১৯৯৫ সালের ১৭ ডিসেম্বরের সেই রাত আজও পুরুলিয়ার খটঙ্গাকে জড়িয়ে রেখেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গে। পরদিন ভোর। খটঙ্গা লাগোয়া গানুডি টোলা। সুভাষ তন্তুবায় নামে এক কলেজপড়ুয়া যুবকের চোখে প্রথম পড়ে দৃশ্যটা। মায়ের ডাকে দরজা খুলতেই সামনে বিশাল ত্রিপল, তার নীচে কাঠের বাক্স। কয়েকটি বাক্স ভাঙা, ছড়িয়ে রয়েছে অচেনা আগ্নেয়াস্ত্র। প্রথমটায় বুঝে ওঠা যায়নি, ঠিক কী পড়ে আছে ওখানে। ভিড় জমতে শুরু করল। কেউ কেউ কৌতূহলবশত বাক্স খুলে অস্ত্র সরাতেও শুরু করলেন। সময়মতো সতর্ক করলেন সুভাষ নিজেই—বাক্সে হাত দেওয়া চলবে না। কিন্তু এটুকু বুঝতে দেরি হয়নি, বিষয়টা মামুলি নয়। ছুটে গেলেন খটঙ্গা হাইস্কুলের শিক্ষক শম্ভুশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। শম্ভুবাবু ঘটনার গুরুত্ব বুঝে নিজের ভাইপো তড়িৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে দিয়ে সুভাষকে পাঠালেন ঝালদা থানায়। নিজেও রওনা দিলেন ঘটনাস্থলের দিকে। ততক্ষণে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, এ শুধু গানুডির ঘটনা নয়। খটঙ্গাকে ঘিরে থাকা বেলামু, মাড়ামু, বেড়াডি, বারুডি, সিমনি, পোগরো—একের পর এক গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে একই রকম বাক্স। গ্রামজুড়ে তখন একটাই প্রশ্ন—আকাশ থেকে কি সত্যিই অস্ত্র ফেলা হয়েছে?

পুলিশও প্রথমে খবরটা বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছে খালি বাক্সের গায়ে যে নাম লেখা মিলল, তাতে চমকে ওঠে তদন্তকারীরা—বাংলাদেশের রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্টের কমান্ড্যান্টের নাম। এর পর শুরু হয় ব্যাপক তল্লাশি। খটঙ্গার পশ্চিমের মাঠ থেকেই উদ্ধার হয় ৪০টি কালাশনিকভ রাইফেল, একটি প্যারাশুট, গুলিভর্তি আটটি বাক্স, সাতটি রকেট লঞ্চার, ১৬টি হ্যান্ড গ্রেনেড, দু’টি ৯ এমএম পিস্তল এবং প্রচুর গুলি। তল্লাশি ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামেও। পোগরো, বেলামু ও বারুডির মাঠ থেকে মেলে আরও একে-৪৭, রকেট লঞ্চার, অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গ্রেনেড, পিস্তল ও বিপুল যুদ্ধসামগ্রী। ২১ ডিসেম্বর ফের খটঙ্গায় তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার হয় ২০টি একে-৪৭ রাইফেল, তিনটি ৯ এমএম পিস্তল, টেলিস্কোপিক সাইট, ম্যাগাজিন, পাউচ এবং প্রচুর ৭.৬২ মিমি গুলি। এই তল্লাশি অভিযানে পুলিশের পাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন জয়পুরের বাসিন্দা, ভারতীয় সেনার জওয়ান অম্বুজ হাজরা। পুকুর থেকে গ্রামের ঘরবাড়ি—সর্বত্র তল্লাশিতে তিনি সাহায্য করেন পুলিশকে। ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বরও চলে অভিযান, মেলে আরও একে-৪৭, পিস্তল, গ্রেনেড ও বিপুল গুলি। সরকারি হিসেব বলছে, ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয় ২২৮টি কালাশনিকভ রাইফেল-সহ বিপুল যুদ্ধসামগ্রী। শেষমেশ মোট ৩০০টির মধ্যে ২৬৪টি কালাশনিকভ রাইফেল উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। কিন্তু প্রায় ১০০টি ৯ এমএম পিস্তলের মধ্যে মিলেছিল মাত্র ১৪টি। বাকিগুলোর হদিস আজও অজানা।

সেই রাতে সুভাষ ও তড়িতের তৎপরতা না থাকলে অস্ত্রের একটা বড় অংশ হয়তো গ্রামবাসীদের হাত ঘুরে চলে যেত অন্যত্র। ঘটনার পরে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী নিজে এসেছিলেন খটঙ্গা ও আশপাশের অস্ত্রপতনস্থল পরিদর্শনে। সুভাষ- তড়িতের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের সাহসিকতার প্রশংসা করে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। সে প্রতিশ্রুতি অবশ্য আর বাস্তবের মুখ দেখেনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পরে ২০০৯ সালে তৎকালীন বাম সরকার দু’জনকে দশ হাজার টাকা করে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও, সেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন তাঁরা।
গল্প কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি। ঘটনার প্রায় ২১ বছর পরে, ২০১৬ সালের অগস্টে অস্ত্র পাচারকারীদের জেরার সূত্র ধরে ফের খটঙ্গার এক ফাঁকা মাঠে অভিযান চালায় পুরুলিয়া পুলিশ। মাটি খুঁড়ে মেলে একটি রকেট লঞ্চার, একটি রকেট এবং একটি একে-৪৭ রাইফেল।
প্রশ্ন থেকে যায়, সেই রাতে আকাশ থেকে যত অস্ত্র নেমেছিল, তার সব কি আদৌ উদ্ধার করা গিয়েছিল?
আজকের খটঙ্গা অবশ্য এই রহস্যঘেরা ইতিহাসকে সরিয়ে রেখে অনেকটাই এগিয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনায় গ্রামের মোট জনসংখ্যা ছিল ১,০৬৫—পুরুষ ৫৪৮, মহিলা ৫১৭। ২০২৬ সালে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১,১০০। গ্রামে ভোটগ্রহণের বুথ একটি, তবে খটঙ্গা হাইস্কুলে আরও একটি বুথ রয়েছে, যা পার্শ্ববর্তী গ্রাম পোগরোর ভোটারদের জন্য নির্দিষ্ট। শিক্ষার দিক থেকেও গ্রাম পিছিয়ে নেই—একটি প্রাথমিক ও একটি উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়াও রয়েছে একটি গ্রন্থাগার, যা প্রমাণ করে জনসংখ্যা কম হলেও শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয় এ গ্রামে। স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য রয়েছে একটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রও। এলাকার উন্নতিতে স্থানীয় রাজপরিবারের অবদান অনেক। তাঁদের দান করা জমিতেই গড়ে উঠেছে স্কুল সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। গ্রামের নাম খটঙ্গা কেন, এ নিয়ে জনশ্রুতি তেমন নেই।তবে একটি কাছাকাছি সংস্কৃত শব্দ হলো "খট্বাঙ্গ" (খট্+বাঙ্গ) — যার অর্থ শিব ও কালীর সঙ্গে যুক্ত একটি তান্ত্রিক অস্ত্র বা লাঠি, যার আগায় খুলি বসানো থাকে, সন্ন্যাসীরা এটি বহন করতেন।

বেলামু পাহাড়ের কোলে খটঙ্গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও কম মুগ্ধ করার নয়। বৃষ্টি নামলে গোটা এলাকা যেন এক রহস্যময় মায়ার চাদরে ঢেকে যায়। সেই মায়া, আর তিন দশক আগের এক রাতের রহস্য—দুই মিলিয়েই আজও খটঙ্গা যেন পুরুলিয়ার মানচিত্রে এক আলাদা অধ্যায়।
▪️▪️▪️

শম্ভুশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক
খটঙ্গা হাইস্কুল
"ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী বিশেষ উল্লেখযোগ্য একটি গ্রাম, যার নাম খটঙ্গা। এই খটঙ্গা গ্রামটি নানা দিক থেকে পুরুলিয়া জেলা তথা পৃথিবীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। মূল কারণ, ১৯৯৫ সালে যে অস্ত্র বর্ষণ হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল খটঙ্গা। সেই কারণে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খটঙ্গা বিশেষ একটি পরিচিত নাম। এই খটঙ্গা গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা বড়ই দুর্বিষহ। বর্তমানে খটঙ্গার আশেপাশে বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামগুলি নানাভাবে আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ একটা সময়ে পাথর শিল্প এখানে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেও, পরবর্তী পর্যায়ে সরকারি বিভিন্ন বিধিনিষেধ এবং নানা ধরনের নানা আইনকানুনের পরিপ্রেক্ষিতে এই শিল্প বর্তমানে প্রায় অবলুপ্ত। তাই এখানকার সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা খুবই শোচনীয়। সরকার প্রদত্ত রেশন ব্যবস্থায় তাদের দুবেলা কোনোভাবেই গ্রাসচ্ছাদন হয়। খটঙ্গাকে কেন্দ্র করে তার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় যে বিপুল পরিমাণে খনিজ সম্পদ রয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার সেগুলি পর্যালোচনা করে যদি উত্তোলন এবং তার সাথেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে সার্বিক পুরুলিয়া জেলার মান আর্থিক দিক থেকে অনেকটাই উন্নত হবে বলে মনে হয়।"
▪️▪️▪️

তরণীসেন হেমব্রম
বাসিন্দা, খটঙ্গা
"গ্রামে এখন রাজনৈতিক ব্যাপার নিয়ে সমস্যা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন সমর্থক। তাঁদের মধ্যে আগেও মতের অমিল ছিলো। কিন্তু আগে গ্রামের সবার সঙ্গে সবার ভালো সম্পর্ক ছিল, সবার সাথে সবার বসা-ওঠা হতো। এখন মতের অমিল সেই সম্পর্কটাকে অনেকটাই নষ্ট করে দিয়েছে। আগে স্কুলেরও পঠন-পাঠনটা ভালো ছিল। এখান থেকে আমাদেরই ব্যাচেরই ছাত্রদের কেউ ডাক্তার হয়েছে, ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, হাই স্কুলের শিক্ষক হয়েছে অনেকগুলো। জলের সমস্যা এখানে আছেই। যে কটা পাইপলাইন হয়েছে তাতেও সঠিকমতো জল পাওয়া যায় না।"