নিজস্ব প্রতিনিধি, বাঘমুন্ডি:
অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশের সেই মেয়েটিই এক দিন হয়ে উঠেছিলেন জঙ্গলমহলের মাওবাদী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। বাঘমুন্ডির আমকোচা গ্রামের মীরা পাহাড়িয়া ওরফে মিনা। দীর্ঘদিন ধরে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরে উঠে এসেছিলেন মাওবাদীদের ‘বেঙ্গল ব্রিগেড’-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। এ বার সেই মীরাই পুলিশের জালে। সঙ্গে গ্রেফতার তাঁর স্বামী তথা সাব-জোনাল কমান্ডার সাগর সিং ওরফে বীরেন এবং যাঁর মাথার দাম পুলিশ রেখেছিল ১৫ লক্ষ টাকা, সেই মাওবাদী রিজিওনাল কমিটির নেতা মদন মাহাতো ওরফে শঙ্কর।পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ড সীমান্তের জঙ্গলে কি মাওবাদী কার্যকলাপের পুরনো নেটওয়ার্ক ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে? সেই প্রশ্নের মধ্যেই এই গ্রেফতারি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে মীরার পুরুলিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগ তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উচ্চপর্যায়ের আন্তঃরাজ্য ভার্চুয়াল বৈঠকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঝাড়খণ্ড পুলিশের এই অভিযান। সূত্রের খবর, বৈঠকে অবশিষ্ট মাওবাদী ক্যাডার এবং ‘আরবান নকশাল’-দের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে টেকনিক্যাল ও ম্যানুয়াল সোর্স আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তার পরেই সরাইকেলা- খরসোওয়া জেলার কাণ্ডরা ও চান্ডিল থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী।
অভিযানে মীরা-সহ তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে একে-৪৭, ৯ এমএম পিস্তল, প্রচুর কার্তুজ এবং ওয়াকিটকি উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি থানার আমকোচা গ্রামের মেয়ে মীরা। এক সময় জঙ্গলমহলের মাওবাদী সংগঠনে তাঁর প্রভাব ছিল যথেষ্ট। সংগঠন চালানোর দক্ষতার কারণে মাওবাদীদের সাব-জোনাল কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ঝাড়খণ্ড সরকার তাঁর মাথার উপর পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, মিসির বেসরা গ্রেফতার হওয়ার পরে মাওবাদী কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ বেঙ্গল ব্রিগেডের সদস্যদের নিয়ে পুরুলিয়া-ঝাড়গ্রাম সীমান্তে ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন। সেই সময় স্থানীয় মহিলাদের সংগঠিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মীরাকে। সেই সূত্রেই মীরার গ্রেফতারিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁদের অনুমান, বাঘমুন্ডির এই বাসিন্দার কাছ থেকে পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ড সীমান্তের জঙ্গলে মাওবাদীদের পুরনো যোগাযোগ, সম্ভাব্য আশ্রয়স্থল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে।
এক সময় পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং বীরভূমে মাওবাদী হিংসা তীব্র আকার নিয়েছিল। লাগাতার অভিযান ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের মার্চের পর দেশে নকশাল-উপদ্রুত জেলার সংখ্যা শূন্যে নেমে আসে। যদিও ‘লিগ্যাসি অ্যান্ড থ্রাস্ট’ হিসেবে ৩৭টি জেলায় এখনও বাড়তি নজরদারি চলছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলির নজরে এখন পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ড সীমান্তের জঙ্গলও। কারণ, এই এলাকাতেই এক সময় মাওবাদীদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। তদন্তকারীদের অনুমান, পুরনো নেটওয়ার্কের অবশিষ্ট অংশ কাজে লাগিয়ে নতুন করে সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশের নেতৃত্বাধীন দলে বর্তমানে হাতে গোনা কয়েক জন সশস্ত্র সদস্যই অবশিষ্ট রয়েছেন। ফলে মীরার মতো স্থানীয় যোগাযোগ থাকা কোনও গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের গ্রেফতারি নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাঘমুন্ডির মেয়ে মীরাকে জেরা করে সেই পুরনো নেটওয়ার্কের কতটা হদিস মেলে, এখন সে দিকেই তাকিয়ে তদন্তকারীরা। পুরুলিয়া সীমান্তের জঙ্গলে ফের মাওবাদী সংগঠনের কোনও ছায়া তৈরি হচ্ছে কি না, তার উত্তরও হয়তো মিলতে পারে এই জেরাতেই।
ছবি : এ আই