দেবীলাল মাহাতো, পুরুলিয়া:
ভাদ্র মাসের শেষ দিন,ভাদ্র সংক্রান্তি। পঞ্চকোট রাজবংশ, আদিবাসী সহ কৃষকদের কাছে দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক মানভূমে দিনটি ছাতা পরব হিসেবে পালিত হয়। এদিনেই অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকর্মা পুজা। কলকারখানার শ্রমিক থেকে মিস্ত্রি , দর্জি থেকে গাড়ির চালক ,কামার থেকে ছুতোর মিস্ত্রী সবাই নিজের নিজের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে দেবশিল্পীকে আরাধনা করেন। বছরের এই দিন নিজ নিজ যন্ত্রপাতিকে তাঁরা বিশ্রাম দেন।
কৃষকের কাছেও দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকরা এদিন সকাল হতেই কৃষকরা ধানের খেতের মাঝে ডাল (সিঁন্দুয়ার , শাল ডাল)পুঁতেন। যাকে বলা হয় 'ইঁদ ডালি পোঁতা। কৃষকদের বিশ্বাস, এই ডালির পাতা শুকিয়ে মাটিতে মিশে গেলে ধানের ফলন ভালো হয়। রোগ-পোকার আক্রমণ থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, কৃষকরা আরও মনে করেন, শুকনো ডালে রাতে পেঁচা বসলে ইঁদুরের উপদ্রব কমে যায় । এই ডালি পোঁতার মধ্যে দিয়েই কৃষকরা এদিন ধানের জমি পরিদর্শন করেন, ফসলের অবস্থা খতিয়ে দেখেন।
বৃহত্তর মানভূম অঞ্চলে ভাদ্র সংক্রান্তির দিন পালিত হয় ছাতা পরব। কয়েকশো বছর ধরে বংশপরম্পরায় প্রথা মেনে চলে চাকলতোড়ে হয়ে আসছে ছাতা পরব। ছাতা পরবে রাজপরিবার ছাড়াও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে দিনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাজতন্ত্র নেই। কিন্তু ঐতিহ্য বহাল। আজও একদিনের রাজা হয়ে বসেন পঞ্চকোট রাজবংশের উত্তরসূরি অমিতলাল সিং দেও। ঘোড়ায় চেপে রাজা আসেন ছাতাট্যাঁড়ে। ওঠানো হয় ছাতা। সেই রাজাকে দেখতে ভীড় জমান কয়েক হাজার মানুষ। বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা ,ছত্রিশগড় থেকেও মানুষজন আসেন।
সাঁওতাল সমাজের মানুষের কাছে ছাতাট্যাঁড় মহামিলনের জায়গা। ছাতা পরবে সামিল হওয়ার মেয়েদের কাছে অত্যন্ত গৌরবের। মেলায় সারারাত ধরে চলে নাচ গান। বসে হাড়িয়ার আসর। সাঁওতাল ছেলে মেয়েরা নিজেরাই খুঁজে নেন আপন জীবন সঙ্গী, সঙ্গিনী। চেহারায় দুজনের মিল থাকলে ফুল পাতিয়ে নেন।
ভাদ্র মাস হল ভাদুর মাস। ভাদ্র সংক্রান্তির দিন পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাদু উৎসব হয়।ভাদুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে পঞ্চকোট রাজবংশের নাম। কথিত আছে, পঞ্চকোটের রাজকন্যা ভদ্রাবতীই হলেন ভাদু। রাজকন্যার অকাল মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতেই এই পুজোর প্রচলন। আবার অনেকে বলেন, ভাদু হলেন ধন-ধান্যের দেবী। গ্রামবাংলার কুমারী মেয়েরা ভাদ্র মাস জুড়ে ভাদু মূর্তি গড়ে পুজো করেন। ভাদু গানই এই পুজোর প্রধান উপাচার। এক মাস ধরে গান বেঁধে, গান গেয়ে সংক্রান্তির দিন ভাদুকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সেই গানেই উঠে আসে সমাজ, প্রেম, দুঃখ, বঞ্চনার কথা। লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ হল এই ভাদু গান।