বিনোদন ব্লক

ফের ভেনিসে সেরা সিনেমার পুরস্কার, পুরুলিয়ার অনুপর্ণা গড়লেন ইতিহাস

এক বছর আগে ভেনিসে সেরা পরিচালক। এ বারও সেই ভেনিসেই পুরস্কার। পুরুলিয়ার নিতুড়িয়া থানার একেবারে ছোট্ট গ্রাম নারায়ণপুর থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদার মঞ্চে পর পর দু’বছর পুরস্কার জিতে নজির গড়লেন অনুপর্ণা রায়।
ফের ভেনিসে সেরা সিনেমার পুরস্কার, পুরুলিয়ার অনুপর্ণা গড়লেন ইতিহাস

 

সুজয় দত্ত , পুরুলিয়া:

এক বছর আগে ভেনিসে সেরা পরিচালক। এ বারও সেই ভেনিসেই পুরস্কার। পুরুলিয়ার নিতুড়িয়া থানার একেবারে ছোট্ট গ্রাম নারায়ণপুর থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদার মঞ্চে পর পর দু’বছর পুরস্কার জিতে নজির গড়লেন অনুপর্ণা রায়। ২০২৫ সালে ‘Songs of Forgotten Trees’-এর জন্য ৮২তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি বিভাগে সেরা পরিচালকের পুরস্কার। আর ২০২৬ সালে তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘Lovers in the Blue Night’ পেল NETPAC Award। ভারতীয় চলচ্চিত্রে অনুপর্ণার এই ধারাবাহিক সাফল্য নতুন করে নজর কেড়েছে।

পুরুলিয়ার নিতুড়িয়ার সরবড়ি গ্রামের লাগোয়া নারায়ণপুরেই বড় হয়ে ওঠা অনুপর্ণার এই যাত্রা অবশ্য মোটেই মসৃণ ছিল না। কর্পোরেট চাকরির নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে নিজের সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে সিনেমা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। বাবা ব্রহ্মানন্দ রায় এক সময় মজা করে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘‘সত্যজিৎ রায় হবি?’’ মেয়ের উত্তর ছিল, সিনেমা বানিয়ে বিদেশ থেকে পুরস্কার নিয়ে ফিরবেন। ২০২৫-এর ভেনিসে সেই কথাই সত্যি করেছিলেন তিনি। এক বছর পরে ফের আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুরস্কার তাঁর হাতে।

অনুপর্ণার প্রথম ছবি ‘Run to the River’ মুক্তি পায় ২০২৩ সালে। পুরুলিয়ার আঞ্চলিক জীবন, ভাষা ও ব্রিটিশ আমলের অবিভক্ত বাংলার সামাজিক বাস্তবতাকে ঘিরে তৈরি ২৩ মিনিটের ওই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র পাখি। অভাবের সংসারে বাল্যবিবাহের মুখে দাঁড়ানো কিশোরীর একমাত্র স্বপ্ন, জীবনে এক বার নদীটিকে নিজের চোখে দেখা। পরিচালকের বাল্যবিবাহিত ঠাকুমার মুখে শোনা স্মৃতি থেকেই ছবিটির অনুপ্রেরণা। রাশিয়া, স্টুটগার্ট, লন্ডন-সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। চেন্নাইয়ের স্ত্রী ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পায় সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির পুরস্কার।

তার পরের ছবি ‘Songs of Forgotten Trees’ অনুপর্ণাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। মুম্বইয়ের এক ফ্ল্যাটে পাশাপাশি থাকা দুই পরিযায়ী নারীর গল্পে এক জন অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখে, পাশাপাশি গোপনে যৌনকর্মীর কাজ করে। অন্য জন কর্পোরেট কর্মী। দুই ভিন্ন জগতের নারীর একসঙ্গে থাকা, একাকীত্ব, অতীতের ক্ষত এবং পরস্পরের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্কই ছবির মূল সুর। ২০২৫-এর ভেনিসে এই ছবির জন্য অরিজোন্তি বিভাগে সেরা পরিচালক হন অনুপর্ণা। ভারতীয় পরিচালক হিসেবে ওই বিভাগে এই সম্মান পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর নামই প্রথম।

পুরস্কার নেওয়ার মঞ্চেও নিজের শিকড়ের কথা ভুলে যাননি তিনি। জানিয়েছিলেন, ‘‘বাংলাকে ধন্যবাদ জানাব। এটা পুরুলিয়ার জয়।’’

এ বার তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘Lovers in the Blue Night’। ২০২৬-এর ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি প্রতিযোগিতা বিভাগে ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। মুম্বইয়ের রাত, প্রান্তিক মানুষের জীবন এবং পরিযায়ী মানুষের টিকে থাকার লড়াইকে ঘিরে তৈরি বহুভাষিক এই ছবিতে রয়েছে হিন্দি, মারাঠি ও সিলেটি বাংলা ভাষার ব্যবহার। চার পরিযায়ী মানুষের জীবন, প্রেম, পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা এবং অস্তিত্বের সংকট একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ছবিতে।

এই ছবির কেন্দ্রে করিম, আমিনা-সহ কয়েকটি প্রান্তিক চরিত্র। করিম নিজের যৌন পরিচয় সমাজের কাছ থেকে আড়াল করে রাখে। তার স্ত্রী আমিনা কাজ করেন বারে এবং ফোন-সেক্স কর্মী হিসাবে। বন্যায় ভেসে যাওয়া গ্রামের অতীত থেকে পালাতে তাঁদের নামমাত্র বিয়ে। সেই সম্পর্কের মধ্যেই জড়িয়ে পড়ে এক চোর ও এক দালালের জীবন। নিঃসঙ্গতা, প্রেম এবং বেঁচে থাকার তাগিদ— এই তিনের টানাপড়েনেই এগিয়েছে অনুপর্ণার নতুন ছবি।

এক বছর আগের সেরা পরিচালকের পুরস্কারের পর এ বার NETPAC Award। অর্থাৎ পুরস্কারের মঞ্চ বদলায়নি, বদলায়নি অনুপর্ণার অবস্থানও— বরং আরও শক্ত হয়েছে তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি। ভেনিসে পর পর দু’বছর পুরস্কারজয়ী ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে তাঁর নাম এখন আলাদা করে উচ্চারিত হচ্ছে।

কুলটি গার্লস কলেজে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা, দিল্লিতে সাংবাদিকতার পাঠ, তার পরে কর্পোরেট চাকরি— সব ছেড়ে সিনেমার দিকে হাঁটা। অভিনয়ের প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের গল্প বলার ভাষাই খুঁজেছেন ক্যামেরায়। আর সেই ভাষার শিকড় বার বার ফিরে গেছে পুরুলিয়ায়।

এখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমহলে অনুপর্ণা রায় মানে শুধু ভেনিসের পুরস্কারজয়ী পরিচালক নন। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা এমন এক নির্মাতা, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক চলচ্চিত্র শিক্ষার বড় ডিগ্রি ছাড়াই নিজের সঞ্চয়, অভিজ্ঞতা এবং গল্প বলার জেদকে সম্বল করে পৌঁছে গিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম বড় চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে। পর পর দুই বছরের সাফল্যে সেই গল্পই যেন আরও বড় হয়ে উঠল।

আর তাই এক বছর আগে বাবার সেই প্রশ্ন— ‘‘সত্যজিৎ রায় হবি?’’— এখন হয়তো নতুন অর্থ পেয়েছে। সত্যজিৎ হওয়ার প্রশ্ন নয়, নিজের মতো করে অনুপর্ণা হয়ে ওঠার গল্পটাই আজ পুরুলিয়ার গর্ব।