ব্লক আমার জন্মভূমি

নদীর পাড়ে উঠছিলো ধোঁয়া, আর তা থেকেই জন্ম যে গ্রামের

দুই দম্পতি জঙ্গলে বসবাস শুরু করার ছয়-সাত দিন পর আগুনের ধোঁয়া উড়তে দেখেন কংসাবতীর ওপারে কাড়া চরাতে আসা বাগালেরা। তাঁরা গিয়ে খবর দেন গোরা মাহাতো নামে এক ব্যক্তিকে। আদতে বাঁকুড়ার বাসিন্দা হলেও, তিনি মামার বাড়ি কুকুরগোড়িয়া থাকতেন । গভীর জঙ্গলে ধোঁয়া এল কীভাবে? গোরা মাহাতো সদলবলে গিয়ে দেখেন জঙ্গলের মধ্যে দুই মহিলা রান্না করছেন। সেই সময় তাদের স্বামীরা শিকারে বেরিয়েছিলেন। ভয় পেয়ে মহিলারা নিজেদের রক্ষা করার আর্জি জানান। ইংরেজদের ভয়ে পালিয়ে এসেছেন বলেও খুলে বলেন সব কথা। তারপর গোরা মাহাতো তাঁদের পাশে দাঁড়ান। জঙ্গলের বেশ কিছুটা অংশ পরিষ্কার করে চাষের উপযোগী করে তোলেন। পরবর্তীকালে তিনিও তাঁদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন।
নদীর পাড়ে উঠছিলো ধোঁয়া, আর তা থেকেই জন্ম যে গ্রামের

দেবীলাল মাহাতো :

কয়েকশো বছর আগে অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশ জুড়ে থাকা পুরুলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। চারদিকে শুধু শাল-পিয়াল-মহুয়ার বন আর হিংস্র পশুর আনাগোনা। মানুষের বসতি তখনও গড়ে ওঠেনি সেভাবে। ইতিহাসের সেই দুর্গম সময়ে ইংরেজদের অত্যাচারের ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসে এই জঙ্গলেই আশ্রয় নিয়েছিলেন দুই সর্দার দম্পতি। সঙ্গে সম্বল বলতে কিছুই ছিল না। খাবার বলতে জঙ্গলের বনের গেঠি আলু আর মাঝে মাঝে শিকারের মাংস। কংসাবতী নদীর তীরে একটা জায়গা বেছে নিয়ে প্রথম কুঠার হাতে জঙ্গল সাফ করেন তাঁরা। গড়ে তোলেন ঝুপড়ির ঘর । আগুন জ্বলে, ধোঁয়া ওঠে, আর তারপর থেকে শুরু হয় এক নতুন জনপদের। ওই দুই দম্পতির সাহস আর অক্লান্ত পরিশ্রমের হাত ধরেই জঙ্গলের বুক চিরে জন্ম হয়েছিল আজকের আড়শা ব্লকের বেলডি গ্রাম পঞ্চায়েতের গৌরাদাগ গ্রামের।

জনশ্রুতি বলে,  দুই দম্পতি জঙ্গলে বসবাস শুরু করার ছয়-সাত দিন পর আগুনের ধোঁয়া উড়তে দেখেন কংসাবতীর ওপারে কাড়া চরাতে আসা বাগালেরা। তাঁরা গিয়ে খবর দেন গোরা মাহাতো নামে এক ব্যক্তিকে।  আদতে বাঁকুড়ার বাসিন্দা হলেও, তিনি মামার বাড়ি কুকুরগোড়িয়া থাকতেন । তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, গভীর জঙ্গলে ধোঁয়া এল কীভাবে? গোরা মাহাতো সদলবলে গিয়ে দেখেন জঙ্গলের মধ্যে দুই মহিলা রান্না করছেন। সেই সময় তাদের স্বামীরা শিকারে বেরিয়েছিলেন। ভয় পেয়ে মহিলারা নিজেদের রক্ষা করার আর্জি জানান। ইংরেজদের ভয়ে পালিয়ে এসেছেন বলেও খুলে বলেন সব কথা। তারপর গোরা মাহাতো তাঁদের পাশে দাঁড়ান। জঙ্গলের বেশ কিছুটা অংশ পরিষ্কার করে চাষের উপযোগী করে তোলেন। পরবর্তীকালে তিনিও তাঁদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন।  জনশ্রুতি, গোরা মাহাতোর নাম অনুসারেই গ্রামের নামকরণ হয় 'গৌরাদাগ'। তারও পরে গ্রামে বসবাস শুরু করে রজপুতরা। গ্রামের বাসিন্দারা গুহিরাম ও দুখিত রজপুতকে (রায়) পুকুর পাড়ে ৯ ডেসিমিল জমি দান করেন। পরে রজপুতরাই খাজনা আদায় করে কাশিপুরের রাজাকে পৌঁছে দিতেন। ফলস্বরূপ রাজা তাদেরকে ৪ সিট মৌজা দান করেন। বর্তমানে গ্রামে মাহাত, সর্দার,রজপুত ছাড়াও মন্ডল,গঁরাই, পরামানিক,রজক, চৌধুরী,দে, ঘাসি, হাঁড়ি,মাহালী, সরকার সহ নানা সম্প্রদায় মানুষের বসবাস রয়েছে।

আড়শা -পুরুলিয়া ভায়া বেলডি পিচ রাস্তা থেকে সোনাঝুরি বনের ভিতর আঁকাবাঁকা পথে দু'কিমি গেলেই পৌঁছানো যায় গ্রামটিতে। আজও গ্রামটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নজর কাড়ে। গ্রামের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে উত্তর দিকে বয়ে যাওয়া কংসাবতী নদীর উপর তৈরি হওয়া 'সতীবেড়া' নামের জায়গাটি। আশ্চর্যজনক ভাবে এখানে নদীটি দুভাগে ভাগ হয়ে কিছুটা গিয়ে , আবার মিশে গিয়েছে । তৈরি হয়েছে অপরূপ এক ভূখন্ড । দূর থেকে দেখলে মনে হয় বিচ্ছিন্ন এক ব-দ্বীপ। গ্রামের বাসিন্দা দেবেন মাহাতো জানান, "দেউলঘাটা, দেউলবেড়ার মতো এখানেও একটি ছোট দেউল ছিল। ১৩০৫ বঙ্গাব্দের বন্যায় তা ডুবে যায়। যার ধ্বংসাবশেষ এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, বর্ষার সময় নদীর দুকুল ভাসিয়ে যায়,তখন সতীবেড়ার সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।" গৌরাদাগ লাগোয়া এই অঞ্চল এতটাই ঘন ছিল যে  বাসিন্দাদের বাঘের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কংসাবতী নদী থেকে বাড়ি আসার পথে এক রাতের সন্ধ্যায় রয়েল বেঙ্গল  টাইগারের মুখোমুখি হয়েছিল এক বাসিন্দা। আহত হয় সে। কোনো ক্রমে সেখান থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচান। আর সেই আতঙ্ক ও লড়াইয়ের স্মৃতির পর থেকেই জায়গাটির নাম হয়ে যায়' বাঘধরা কানালী।' বেশ কয়েক বছর আগেও ওই এলাকায় চিতাবাঘের দেখা মিলেছিল বলে গ্রামবাসীদের দাবি। গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, "বর্তমান প্রজন্মের কাছে  বিষয়টি অজানা থাকলেও, 'বাঘধরা কানালী 'র এই ঘটনা সময়ের সিন্দুকে লুকিয়ে থাকা  জীবন্ত এক ইতিহাস।" তবে গ্রামের দক্ষিণ -পশ্চিম প্রান্তে আজও রয়েছে গিয়েছে সুগভীর সোনাঝুরির জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে সরু এক জোড়। বর্ষায় জল বাড়ে, শীতে শুকিয়ে আসে। মাঝেমধ্যেই ওই জঙ্গলে লাকড়া, হায়নার মতো হিংস্র জন্তুর দেখা মেলে।  শুধু হিংস্র পশুই নয়। সোনাঝুরির এই অংশে দেখা মেলে ময়ূরের।  চোখে পড়ে অজগর সাপও। একসময়ের ঘন জঙ্গল এখন অনেকটাই উজাড় হয়ে গেলেও, দক্ষিণ -পশ্চিম দিকের এই বনটুকুই এখনও গৌরাদাগের বন্যপ্রাণের শেষ আশ্রয়। প্রকৃতি আর মানুষের সহাবস্থানের ছবিটা এখানে এসেই চোখে পড়ে।

 

জঙ্গল ঘেরা সেই গৌরাদাগ এখন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। শাল গাছের বদলে গ্রামকে ঘিরে রেখেছে সোনাঝুরি গাছের সারি। কংসাবতী নদীর তীরে জন্ম নেওয়া জনপদ আজ পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রাম । বর্তমানে গ্রামের ৪টি পাড়ায় ৩৫০ টি পরিবারের বসবাস। ২০২৬ সালে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১৩০০জন। ধর্মীয় দিক থেকেও আজ সমৃদ্ধ গৌরাদাগ। গ্রামে রয়েছে একটি হরিমন্দির,একটি শিবমন্দির,একটি মহাবীর মন্দির, একটি দুর্গা মন্দির। কথিত আছে,বাংলা ১৩৩০ সালের চৈত্র মাসে  গ্রামে  ভয়াবহ ভাবে গুটি বসন্ত ছড়িয়ে পড়ে । মারা যান দু'জন। পরিত্রাণ পেতে গ্রামবাসীরা আলোচনা করে গ্রামে দুর্গাপুজা (বাসন্তী পুজা)শুরু করেন। তারপর থেকেই গ্রামে বাসন্তী পুজা ধূমধাম সহকারে হয়ে আসছে। পুজোকে ঘিরে কয়েক দিন ধরে যাত্রা, মনসামঙ্গল , বাউলগান, ঝুমুর নাচ,ছৌনাচ সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গ্রামের শিবমন্দিরের মধ্যে বিশেষত্ব রয়েছে।এখানে একটি গম্ভীরার মধ্যে দুটি শিবলিঙ্গ অবস্থান করছে। গ্রামবাসীদের দাবি, যা আর কোথাও দেখা  যায় না । শিক্ষার দিক থেকেও পিছিয়ে নেই গ্রাম। গ্রামে রয়েছে একটি প্রাথমিক স্কুল , আনন্দমার্গের একটি স্কুল , একটি হাইস্কুল, দুটি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র । তবে স্কুল গড়ে তোলার নেপথ্যে গ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী প্রয়াত শংকর মাহাতোর বিশেষ অবদান ছিল বলে জানান স্থানীয়রা। গ্রামে রয়েছে ভূমি ও ভূমি সংস্কারের আর, আই অফিস। জমি সংক্রান্ত ছোট কাজের সুরাহা সেখানে হয়ে থাকে। গ্রামের ঢোকার রাস্তাটি কাঁচা মোরাম থেকে কংক্রিটের হয়েছে। গ্রামে  জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের সহায়তায় পানীয় জলের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। পাইপ লাইনের মাধ্যমে বাসিন্দারা বাড়িতে বাড়িতে বিশুদ্ধ পানীয় জল পান। রেশন সংগ্রহের জন্য তাঁদের বাইরে যেতে হয় না। গ্রামেই রয়েছে সরকারি রেশন দোকান। বিদ্যুৎ পরিষেবা অনেকটাই ভালো বলে জানান বাসিন্দারা ।

একসময় গৌরাদাগের বাতাসে ভাসত ঢোল-ধামসার শব্দ আর ঝুমুর গানের সুর । গ্রামে ছিল ছৌনাচের চর্চা।  ছিল নিজস্ব ছৌনাচের দলও। এলাকার আদি পার্টি হিসেবে তোড়াং, মানকিয়ারির পাশাপাশি উচ্চারিত হত গৌরাদাগের নাম। গ্রামের নাম উজ্জ্বল করেছিলেন মাহিন্দি সিং, জীবন সিং, জগমোহন মাছোয়ার-এর মতো ছৌশিল্পীরা। তাঁদের নাচ আর অভিনয়ের দক্ষতায় দূর-দূরান্তে পরিচিতি পেয়েছিল এই গ্রাম। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই দল আর নেই। কমে আসছে সাংস্কৃতিক চর্চাও । কুঠার হাতে জঙ্গল সাফ করে জন্ম নেওয়া  গৌরাদাগ আজ ইতিহাস, প্রকৃতি ও লোকসংস্কৃতির মেলবন্ধনে এখন আড়শার মানচিত্রে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।

▪️▪️▪️

দেবেন মাহাত
গ্রামের বাসিন্দা

আমার জন্ম এই গ্রামেই। কংসাবতীর তীরে, সোনাঝুরির ছায়ায় বেড়ে ওঠা আমার। ছোটবেলা থেকেই পূর্বপুরুষদের মুখে গ্রাম গড়ে ওঠার কাহিনী শুনে রোমাঞ্চিত হয়ে পড়তাম। ইংরেজের ভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে আসা দুই সর্দার দম্পতি, কুঠার হাতে জঙ্গল কেটে প্রথম ঘর বাঁধা — সেই সাহসের গল্পগুলোই ছিল আমার ঘুমপাড়ানি গান। সেই স্মৃতি আর গর্ব নিয়েই আমার বড় হওয়া। আমার চোখে গৌরাদাগের সবচেয়ে জীবন্ত অংশটা হল গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিমে পড়ে থাকা সুবিস্তৃত জঙ্গল। শাল কমেছে, সোনাঝুরি বেড়েছে। তবুও জঙ্গলটা আজও তার নিজস্বতা ধরে রেখেছে । এই জঙ্গলই গৌরাদাগের আসল পরিচয়। দক্ষিণ-পশ্চিমের এই বন — যেখানে এখনও বন্যপ্রাণেরা নিঃশব্দে বেঁচে রয়েছে। পূর্বপুরুষদের হাতে শুরু হওয়া গ্রামটা আজ অনেক বদলেছে। তবুও জঙ্গল, নদী আর মানুষের মেলবন্ধনটা একই আছে।  
আমার কাছে গৌরাদাগ তাই শুধু একটা ঠিকানা নয়। এটা আমার শেকড়, আমার গল্প, আমার বড় হয়ে ওঠার সাক্ষী।

▪️▪️▪️

অধর মাহাত 
গ্রামের বাসিন্দা

নিজের জন্মভূমিকে নিয়ে বর্ণনা করতে কার না ভালো লাগে। একটি সমৃদ্ধ গ্রাম বলতে যা বোঝায়, তার সবই আছে আমার গ্রাম গৌরাদাগে। আমার চোখে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই আসল সম্পদ। চাষের খেত, সোনাঝুরির বন, আর গ্রামীণ সাদামাটা জীবন। বিলাস-বৈভব ছাড়াই দিব্যি কেটে যায় দিন। ঋতুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলায় গ্রামের রূপ। শরতে মাঠের আল ধরে ফোটে সাদা কাশফুল। বসন্তে লাল পলাশে রঙ ধরে গোটা জঙ্গল। আর বর্ষায় কংসাবতী নদী দু'কূল ছাপিয়ে বয়ে যায়। তখন 'সতীবেড়া'র রূপ হয় দেখার মতো। গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিমে যে সুবিস্তৃত সোনাঝুরির বন আছে, তা দেখলে শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরির কথাই মনে পড়ে যায়। শান্ত, ছায়াঘেরা, পাখির ডাকে মুখর। আমার চোখে গৌরাদাগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে কংসাবতীর তীরের 'সতীবেড়া'য়। নদী এখানে দু'ভাগ হয়ে আবার মিশেছে। তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক এক ব-দ্বীপ। যদি এই এলাকাকে পরিকল্পিত পিকনিক স্পট হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে অচিরেই জেলার পর্যটন মানচিত্রে উজ্জ্বল জায়গা করে নেবে গৌরাদাগ।