উৎসবের আলোয় ধর্ম ও পুজোপাঠ ব্লক

বাপের বাড়িতে ১ মাসের বেশি থাকেন উমা, পুরুলিয়ায় কোন গ্রামে ২৫৯ বছরের প্রথা?

বিজয়া দশমীতেই কি ফুরিয়ে যায় দুর্গাপূজার আনন্দ? ক্যালেন্ডার আর দশটা জায়গার জন্য তেমনটা হলেও, ব্যতিক্রমী ছবি ধরা পড়ে পুরুলিয়ার মানবাজার ১ নম্বর ব্লকের বিশরি গ্রাম পঞ্চায়েতের এক গ্রামে।
বাপের বাড়িতে ১ মাসের বেশি থাকেন উমা, পুরুলিয়ায় কোন গ্রামে ২৫৯ বছরের প্রথা?

 

 

নিজস্ব প্রতিনিধি, মানবাজার:

বিজয়া দশমীতেই কি ফুরিয়ে যায় দুর্গাপূজার আনন্দ? ক্যালেন্ডার আর দশটা জায়গার জন্য তেমনটা হলেও, ব্যতিক্রমী ছবি ধরা পড়ে পুরুলিয়ার মানবাজার ১ নম্বর ব্লকের বিশরি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধুপুর গ্রামে। যেখানে সিঁদুর খেলা, চোখের জল আর প্রতিমা বিসর্জনের গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে মা দুর্গাকে একেবারে ঘরের মেয়ে হিসেবে আগলে রাখার এক অপূর্ব নজির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ২৫৯ বছর ধরে চলে আসা এই নিয়মে দশমীর রেশ তো কাটেই না, উল্টে পুজোর আনন্দ দীর্ঘায়িত হয় দীর্ঘকাল ধরে কখনও ৮ দিন অতিরিক্ত অষ্টমঙ্গলার মাধ্যমে, আবার কখনও একেবারে কালীপুজো পর্যন্ত।

হিন্দু বাঙালি ঐতিহ্য অনুযায়ী বিয়ের পর মেয়েরা বাপের বাড়ি এসে অষ্টমঙ্গলায় অংশ নেয়। আর মধুপুর গ্রামের সেন পরিবারে দেবী উমাকে দেখা হয় সাক্ষাৎ ঘরের মেয়ে হিসেবে। তাই সাধারণ নিয়ম মেনে বিজয়া দশমীতে মা কৈলাসে পাড়ি দিলেও, এই পরিবারের উমা থেকে যান আরও আট দিন।

পরিবারের সদস্য প্রণবকুমার সেন বলেন, "আমাদের পুজোর বিধান রয়েছে, মাকে অষ্টমঙ্গলার পরেই কেবল বিদায় জানানো সম্ভব। মা আমাদের কাছে একেবারে মেয়ের মতো। তাই তাঁর অষ্টমঙ্গলা ছাড়া বিসর্জনের প্রশ্নই ওঠে না।"
তবে নিয়মের কড়াকড়ি এখানেই শেষ নয়। পরিবারের বিধান অনুযায়ী, অষ্টমঙ্গলার পরের দিনটি যদি 'জোড় দিবস' হয়, তবে সেদিনও প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া নিষেধ। যেমন চলতি বছর গত ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী হওয়ার পর ৩০ অক্টোবর অষ্টমঙ্গলা পড়ার কথা থাকলেও, সেই দিনটি জোড় দিবস হওয়ায় সেদিন প্রতিমা নিরঞ্জন হয়নি। চিরাচরিত নিয়ম মেনে পরের দিন ৩১ অক্টোবর শনিবার অর্থাৎ বিজোড় দিনে গ্রামের বড় পুকুরে সেন পরিবারের প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়। বিসর্জনের আগে মহিলারা ফের সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন, হয় মায়ের বরণ, আরতি এবং ভোগ নিবেদন। সেন পরিবারের এই অষ্টমঙ্গলার রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় গ্রামের অন্য চিত্র। মধুপুর গ্রামেরই ঘোষ বাড়ির দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের জন্য আরও দীর্ঘ অপেক্ষা চলে তাদের প্রতিমা বিসর্জন হয় একেবারে কালীপুজোর পর। এখানে আবার শুধু মেয়ে নন, জামাই মহাদেবকেও একই চালচিত্রে রেখে আপ্যায়ন করার রীতি।

ফলে দুর্গাপূজার বিদায়লগ্নে চারদিকে যেখানে বিষাদের সুর বেজে ওঠে, ঠিক তার উল্টো ছবি দেখা যায় এই মধুপুর গ্রামে। দেবীকে কেন্দ্র করে পাড়ায় পাড়ায় হাসিখুশি, পুজোর আমেজ আর উৎসবের রেশ জিইয়ে থাকে একটানা বহুদিন ধরে। ২৫৯ বছরের এই প্রাচীন প্রথা আজ কেবল একটি পারিবারিক পুজো নয়, বরং বাংলার আবহমান সংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।