
দেবীলাল মাহাতো :
গ্রাম একটাই । কিন্তু দুর্গাপুজো হয় সাতটি। রয়েছে আলাদা আলাদা মন্দির । সেই পুজোয় রীতি কিন্তু এক । আনন্দও একসঙ্গে। ঢাকের বোলে, দোলার দোলায় বাঁধা পড়ে গোটা গ্রাম। ক’টা দিন তাই উৎসবের থেকেও বড় হয়ে ওঠে মিলনমেলা। জাত-পাত, পাড়া-প্রতিবেশীর গণ্ডি পেরিয়ে একসঙ্গে আনন্দে মাতেন মানবাজার ১ নম্বর ব্লকের ঝাড়বাগ্দার বাসিন্দারা।

সময়টা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। এলাকায় উৎকল সমাজের মানুষজন সত্ত্ব লাভ করেন। তার পরেই ১৮৬০-এর দশকে ঝাড়বাগ্দা গ্রামে শুরু হয় দুর্গাপুজো। গ্রামবাসীরা জানান, সেই একটি পুজো দিয়েই সূচনা। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও ছ’টি পুজো শুরু হয়। বর্তমানে পাঁচটি মন্দিরে ও দু’টি বাড়িতে ঘটপুজো হিসেবে মোট সাতটি পুজো অনুষ্ঠিত হয়। মন্দির আলাদা হলেও উৎসব একটাই। সাতটি পুজো ঘিরেই গ্রাম জুড়ে চলে উৎসব। পাড়ায় পাড়ায় বিভেদ ভুলে একসঙ্গে পুজোয় মাতেন সকলে। মহাসপ্তমী, সন্ধিপুজো ও মহানবমীতে প্রতিটি মন্দিরে আঁখবলি দেওয়া হয়। যা গ্রামের পুরনো ঐতিহ্যের অংশ। একটি গ্রামে সাতটি দুর্গাপুজোর প্রচলন রীতিমতো বিরল বলেই মনে করছেন ঝাড়বাগ্দার বাসিন্দারা। এই ভাবেই অতীতের ঐতিহ্যকে সাক্ষী করেই, সাবেকিয়ানার হাত ধরে শরতে মায়ের আরাধনায় মাতে ঝাড়বাগ্দা। গ্রামের বাসিন্দা সুপ্রিয় মাহান্তী জানান, "দুর্গাপুজায় গ্রামের সকলে একসাথে আনন্দে মাতেন। পূজার সময় গ্রামের সব মন্দিরের দোলা একসঙ্গে ঠাকুরপুকুরে যাওয়া এবং বিসর্জনের পর একইসঙ্গে ফিরে আসা এক উপভোগ্য দৃশ্য।"

মানবাজার সদর শহর থেকে পশ্চিমে বরাবাজার রাস্তায় মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ঝাড়বাগ্দা গ্রাম। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে গ্রামটি বেশ বড়। প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসেবেই পরিচিত। ৪০০ পরিবারে প্রায় ২৫০০ মানুষের বসবাস। গ্রামের পূর্বে মানবাজার, পশ্চিমে পাহাড় , উত্তরে রাজাগ্রাম ও দক্ষিণে বরুডি গ্রাম অবস্থিত। পাহাড়ের কোলে সৌন্দর্যে ভরপুর এই গ্রাম এক সময় ঘন ঝোপঝাড় ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। লোকমুখে প্রচলিত, বহু বছর আগে এই অঞ্চলে বাঘ, ভালুক, হরিণ-সহ নানা বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ছিল। চার দিকে ছিল ঘন ঝাড় বা ঝোপ। সেই ঝাড়ের মধ্যে হামেশাই ছিল বাঘের আনাগোনা। সেই থেকেই লোকমুখে গ্রামের নাম হয় ঝাড়বাগ্দা, এমনটাই মনে করেন প্রবীণ বাসিন্দারা।যদিও এই নামকরণ নিয়ে গ্রামবাসীদের মধ্যেই রয়েছে মতানৈক্য। কারও মতে, ঝাড় আর বাগদা— দুইয়ের মিলনে নামকরণ। আবার কেউ বলেন, ইতিহাস আরও প্রাচীন। তবে নামের উৎস নিয়ে দ্বিমত থাকলেও, ঝাড়বাগ্দা নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রোমাঞ্চ আজও টানে গ্রামবাসীদের।

বর্তমানে গ্রামটি বনভূমি, পুকুর ও পাহাড়ে ঘেরা। প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম। পাহাড়ের জঙ্গলে এখন বনশুয়োর, হায়না, শেয়াল, খরগোশ-সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী এবং নানা প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। গ্রামের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে গ্রাম লাগোয়া পাহাড়টি। অথচ দু’দশক আগেও ছবিটা ছিল অন্য রকম। পাহাড়টি ছিল রুক্ষ, ন্যাড়া পাহাড়ি টিলা। গাছপালার চিহ্ন ছিল না বললেই চলে। সেখান থেকেই শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। গ্রামবাসীদের একটি ছোট্ট উদ্যোগে প্রাণ ফিরে পায় পাহাড়টি। একটি সংস্থার সহযোগিতায় সেই পাহাড়ে শুরু হয় গাছ লাগানো । আর সেই গাছের প্রতিপালন করতে থাকে গ্রামবাসীরা । তার পরেই ছবিটা বদলাতে থাকে। সেই গাছগুলো ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে ওঠে। বর্তমানে ২৬৭ একর এলাকা জুড়ে এখন শুধুই গভীর জঙ্গল। এই জঙ্গল এখন শিক্ষার্থীদের কাছে ভ্রমণ তীর্থ। প্রতি বছর বহু পড়ুয়া এখানে আসেন প্রকৃতির পাঠ নিতে। নেড়া পাহাড় কিভাবে সবুজ হল , সেই গল্প শুনতে। পাহাড়, জঙ্গল ও জীববৈচিত্র্যকে কাছ থেকে একসাথে দেখে তারা।

ঝাড়বাগ্দা গ্রামের অধিকাংশ মানুষই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। চাষই এখানে মূল জীবিকা। তবে শিক্ষা-দীক্ষাতেও পিছিয়ে নেই গ্রামবাসীরা। গ্রামে রয়েছে সংস্কৃতি চর্চারও দীর্ঘ পরম্পরা। তবে শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬৪ সালে। সেই থেকে নীরবে মানুষ গড়ার কাজ করে চলেছে স্কুলটি। এ ছাড়াও গ্রামে রয়েছে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। গ্রামেই গড়ে উঠেছে মানভূম মহাবিদ্যালয়। যা এলাকায় উচ্চশিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। পানীয় জলের তেমন একটা সমস্যা নেই বলে জানান গ্রামবাসীরা। গ্রামে রয়েছে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের পানীয় জল প্রকল্প। সেই প্রকল্প থেকেই মেলে জল। মাঝে মধ্যেই সেই প্রকল্প থেকে জল পরিষেবা ব্যাহত হয় বলে জানান গ্রামবাসীরা।তবে যোগাযোগের নিরিখে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে এই গ্রাম।

বর্তমানে গ্রামে উৎকল ব্রাহ্মণ ও দেশোয়ালি মাঝি সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। এ ছাড়া ভূমিজ(সর্দার) ,মন্ডল, রাজোয়াড়, কর্মকার, রজক সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসবাস গ্রামে। তবে গ্রামের আদি বাসিন্দা ছিল ভূমিজরাই । স্থানীয় ইতিহাস বলছে, ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত এই গ্রামে জৈন ধর্মাবলম্বী সরাকদের বসবাস ছিল। ১৫৯৩ সাল নাগাদ মানভূমে সরাক সমাজের ইতিহাসে এক অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। লোককথা অনুযায়ী, তৎকালীন মানভূমের রাজা এক সরাক কন্যার প্রতি অনুরক্ত হয়ে তাঁকে বিবাহ করতে চান। রক্ষণশীল ও ধর্মপরায়ণ জৈন সরাক সমাজ এই প্রস্তাবে আপত্তি জানায়। সংঘাতে না গিয়ে তাঁরা মানভূম পরগনা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা পঞ্চকোট রাজার শরণাপন্ন হন । প্রতিজ্ঞা করেন, মানভূমের জল আর স্পর্শ করবেন না। চার শতাব্দী পরেও সরাক সমাজের অধিকাংশ মানুষ সেই প্রতিজ্ঞা মেনে চলেন। তাই মানবাজারে তাঁদের উপস্থিতি আজও নগণ্য। সরাকদের চলে যাওয়ায় বহু গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ে। তাঁদের বহু জৈন মন্দির পরে হিন্দু উপাসনালয়ে রূপান্তরিত হয়। যদিও কারুকাজে গ্রামে জৈনদের প্রভাব আজও স্পষ্ট। গ্রামে থাকা প্রাচীন পাতকুয়ো ও বনভৈরবের থান আজও তাঁদের বসবাসের প্রমাণ বহন করছে। সরাকরা চলে যাওয়ার পর এখানে রাজার ঘাটোয়াল বা পাইক হিসেবে সিং সর্দাররা বসবাস শুরু করেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে, সম্ভবত ১৭৭৩ সালে, মানভূম রাজার পরামর্শদাতা হিসেবে কর্মরত ভীম মাহান্তী পরিবার নিয়ে ঝাড়বাগ্দা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, তিনিই কার্যত জনশূন্য গ্রামকে পুনরুজ্জীবিত করেন।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের ক্ষেত্রেও ঝাড়বাগ্দা গ্রামের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। শতাব্দী প্রাচীন দুর্গাপুজো থেকে ভকতা ঘুরা, উৎসবেই বাঁধা পড়ে ঝাড়বাগ্দা। গ্রামে রয়েছে কুলদেবতা রসিক নাগর জীঊর মন্দির। রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে যাত্রা-সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় সেখানে। যা গ্রামবাসীর পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষের কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কারণ। কথিত আছে, আনুমানিক ২৫০ বছর আগে মাহান্তীদের পূর্বপুরুষ ভীম মাহান্তী বরাবাজারের রসিকনগর থেকে রাধাকৃষ্ণের অষ্টধাতুর বিগ্রহটি এখানে নিয়ে আসেন। সেই থেকেই গ্রামে নিত্য পুজো পেয়ে আসছেন রসিক নাগর জীঊ। রাস উৎসবও এখানে যথেষ্ট আকর্ষণীয়।এছাড়া বনভৈরবের থানে ভকতা ঘুরার অনুষ্ঠান দেখতে বহু মানুষের সমাগম হয়। গ্রামবাসীদের মতে, দুর্গাপুজা ছাড়াও এই সমস্ত উৎসবই গ্রামের মানুষের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনাকাটা এবং বিভিন্ন পরিষেবার জন্য গ্রামবাসীকে মূলত মানবাজার শহরের উপরেই নির্ভর করতে হয়। হাটবাজার, চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কাজ, সব কিছুতেই ভরসা সদর শহর। তবুও তার মধ্যেই নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে চলেছে গ্রামটি। গ্রামের নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ, দেড়শো বছরের বেশি পুরনো দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, ২৬৭ একরের সৃজিত জঙ্গল আর সামাজিক বন্ধন ঝাড়বাগ্দাকে আলাদা করে চেনায়। তবে উৎসবের আলোর আড়ালে গ্রামের রয়ে গিয়েছে বেশ কিছু সমস্যা।
তার মধ্যে অন্যতম হল নিকাশি নালা। পথবাতি না থাকায় কিছু পাড়ায় সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে অন্ধকার বলে জানান গ্রামবাসীরা।
▪️▪️▪️

সুপ্রিয় মাহান্তী
গ্রামের বাসিন্দা
মানবাজার শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে, পাহাড়ের কোলে আমার জন্মভূমি ঝাড়বাগ্দা। এক কথায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।
কথিত আছে, একসময় ঘন ঝোপঝাড়ে ভরা এই অঞ্চলে বাঘ, ভালুক, হরিণের বিচরণ ছিল। ঝোপে বাঘের প্রাচুর্য থেকেই নাম হয় ঝাড়বাগ্দা।
বর্তমানে গ্রামটি বনভূমি, পুকুর ও পাহাড়ে ঘেরা। জঙ্গলে এখনও বনশুয়োর, হায়না, খরগোশ-সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী এবং নানা প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা আমাদের গ্রামকে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। গ্রামে সাতটি দুর্গাপুজো হওয়ায় পুজোগুলি গ্রামের সুনাম বাড়িয়েছে। মন্দির আলাদা হলেও গ্রামবাসী একত্রে মিলেমিশে পুজোয় অংশ নেন। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া অনেকে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মরত। শিক্ষার প্রসার ও সাংস্কৃতিক চর্চার জন্যও আশপাশের এলাকায় পরিচিত আমাদের গ্রাম।
ঝাড়বাগ্দা শুধু আমার জন্মভূমি নয়, এটি আমার শিকড়, আমার গর্ব। এখানকার প্রকৃতি, শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। গ্রামের মানুষ পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করেন। আমার জন্মভূমির এই সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতি চিরকাল অমলিন থাকুক— এই আমার কামনা।
▪️▪️▪️

অরিন্দম সিংহ মহাপাত্র
গ্রামের বাসিন্দা
আমাদের গ্রাম ঝাড়বাগ্দা। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নাম। শুধু দুর্গাপুজোই নয়, রাস উৎসবে যাত্রাপালা, বনভৈরবের থানে ভকতা ঘোরা— সবেতেই মিলেমিশে একাকার হয় আমার গ্রাম। গ্রামে রয়েছে কুলদেবতা রসিক নাগর জীঊর মন্দির। রাসপূর্ণিমা উপলক্ষে সেখানে যাত্রা-সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। যা গ্রামবাসীর পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষের কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কারণ। কথিত আছে, আনুমানিক ২৫০ বছর আগে মাহান্তীদের পূর্বপুরুষ ভীম মাহান্তী বরাবাজারের রসিকনগর থেকে রাধাকৃষ্ণের অষ্টধাতুর বিগ্রহটি এখানে নিয়ে আসেন। সেই থেকেই গ্রামে নিত্য পুজো পেয়ে আসছেন রসিক নাগর জীঊ। এছাড়াও গ্রামে রয়েছেন সিংহ মহাপাত্রদের কুলদেবতা পদ্মনাভ জিঊ । তারও পূজা আনুমানিক ২০০ বছর আগে শুরু হয় । ছোট বেলার প্রতিটি স্মৃতি পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে এই গ্রামের সাথে। পাহাড়, জঙ্গল ঘেরা এই গ্রাম শিখিয়েছে কী ভাবে একসাথে থাকতে হয়। তাই ঝাড়বাগ্দা আমার জন্মভূমি নয় , আমার অহংকার।