সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:
পেশায় শিক্ষক। কিন্তু মনে প্রাণে একজন শিল্পী। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো তালিম না থাকলেও প্রতিভার জোরে গত একুশ বছর ধরে নিজের কল্পনায় লক্ষ্মী প্রতিমা গড়ে চলেছেন পুরুলিয়া শহরের রাঁচি রোড বাইলেনের বাসিন্দা শংকর মুখোপাধ্যায়। তিনি পুরুলিয়ার বেলকুঁড়ি রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশনের সংস্কৃতের শিক্ষক। তবে তাঁর শিল্পচর্চার বিষয়টি কেবল পুজোয় সীমাবদ্ধ নয়, প্রতিবারই তাঁর সৃষ্টিতে থাকে সমাজের জন্য এক অনন্য বার্তা। ফি বছর মহালয়ার আগে নিজের তৈরি প্রতিমা টবের মাটিতে বিসর্জন দিয়ে, সেই মাটি থেকেই পরবর্তী বছরের জন্য নতুন প্রতিমার রূপদান করেন এই শিক্ষক। শুধু তাই নয়, দেবীর পরনের শাড়ি থেকে শুরু করে সাজসজ্জা,সবটাই তার নিজের হাতে তৈরি। চলতি বছরে তাঁর একুশ বছরের পুজোয় উঠে এসেছে এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা, নারী শিক্ষার মাধ্যমে সমৃদ্ধি।
শিল্পী তথা শিক্ষক শংকর মুখোপাধ্যায় বলেন, "শহরাঞ্চলে নারীশিক্ষার প্রসার সন্তোষজনক হলেও গ্রামাঞ্চলে এখনো মেয়েরা যথাযথ প্রায়োরিটি পায় না। সমাজে প্রকৃত সমৃদ্ধি আনতে হলে নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমান অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তাই আমার এ বছরের প্রতিমায় মা লক্ষ্মীর পাশাপাশি নারায়ণের মূর্তিও রাখা হয়েছে, যা নারী-পুরুষের মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই সমৃদ্ধির প্রতীক।"
শিক্ষকতার ব্যস্ত রুটিনের মাঝে কীভাবে সময় পান এমন নিখুঁত শিল্পকর্মের? এই প্রশ্নের উত্তরে শংকর মুখোপাধ্যায় সগর্বে জানান ,এটা আমার ছোটবেলা থেকেই বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। কাজটা করতে ভালো লাগে বলেই শিক্ষকতার ফাঁকে সময় বের করে নিই। যতক্ষণ না কাজটা পরিপূর্ণতা পায়, মনে স্বস্তি পাই না। আমি কোনো দিন হাতে-কলমে শিল্পকলা শিখিনি, মনের ভাবনা থেকেই এগুলো রূপ দিয়েছি। মনে যেমন আসে, সেগুলোই নিয়ে কাজ
করি।
এর আগেও পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দিতে প্লাস্টিকের বর্জ্য পদার্থ দিয়ে প্রতিমা গড়েছেন তিনি। কৌতূহলী ও সৃষ্টিশীল এই শিক্ষক অতীতে পঞ্চশস্য দিয়ে, এগারো রকম মাটি ও এগারো রকম জল দিয়ে, এমনকি পাট দিয়েও অনন্য প্রতিমা তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলোর ভাবনাও অতীতে তার শিল্পে জায়গা করে নিয়েছে।
লেখাপড়ার পাঠশালার গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার আলো ছড়ানোর পাশাপাশি নিজের হাতের জাদুতে সমাজ বদলের বার্তা দিয়ে চলেছেন শংকরবাবু। তাঁর এই অনন্য সাধনা ও শিল্পকর্ম আজ পুরুলিয়াবাসীর কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।