নিজস্ব প্রতিনিধি , পুরুলিয়া :
‘তারিখ পে তারিখ’— আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে জনপ্রিয় হিন্দি ছবির সেই সংলাপ এখনও বহু মানুষের হতাশার প্রতীক। মামলার জট, বারবার শুনানির দিন পিছিয়ে যাওয়া আর খরচের বোঝায় নাজেহাল সাধারণ মানুষের কাছে তাই ভরসার নাম হয়ে উঠছে লোক আদালত। শনিবার পুরুলিয়া জেলা আদালত চত্বরে আয়োজিত লোক আদালতে এক দিনেই নিষ্পত্তি হল ২৭৮১টি মামলা। আদায় হল ৭৮ লক্ষ ১৭ হাজার ৯৮০ টাকা জরিমানা।
তবে এ দিনের লোক আদালতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অন্য একটি ছবি। বিচারকের আসনে বসেছিলেন সাত জন মহিলা। তাঁরা কেউ আইনজীবী নন, কেউ পেশাদার বিচারকও নন। সমাজসেবা ও শিক্ষার জগতের সঙ্গে যুক্ত এই সাত মহিলা বিচারকদের সহায়তায় মামলার মীমাংসার কাজে অংশ নেন। আদালত চত্বরে তাঁদের উপস্থিতি যেমন কৌতূহল তৈরি করেছে, তেমনই নারী ক্ষমতায়নের এক ব্যতিক্রমী নজিরও গড়েছে।
এ দিন বিচারকের ভূমিকায় ছিলেন সমাজসেবী সুদেবী দাঁ, শান্তময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুস্মিতা রায়চৌধুরী, পুরুলিয়া গভর্নমেন্ট গার্লস হাইস্কুলের কোয়েল মারান্ডি ও কৃষ্ণা সাহা এবং চিত্তরঞ্জন গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকা সমাপ্তি মল্লিক, ঝুমা মণ্ডল ও শুভ্রা মাহাতো।
জেলা আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, মোট ৪৭২৪টি মামলা শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত ছিল। তার মধ্যে ২৭৮১টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। ব্যাঙ্ক ঋণ সংক্রান্ত বিরোধ, টেলিফোন বিল সংক্রান্ত সমস্যা-সহ নানা ধরনের মামলার মীমাংসা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই বকেয়া ঋণ শোধের জন্য সহজ কিস্তির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
সুদেবী দাঁ বলেন, ‘‘ব্যাঙ্কিং সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মামলার নিষ্পত্তির কাজে যুক্ত ছিলাম। এই দায়িত্ব পালন করতে পেরে খুব ভাল লাগছে।’’ প্রথম বার বিচারকের আসনে বসার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে সুস্মিতা রায়চৌধুরীর কথায়, ‘‘ব্যাঙ্কিং এবং বিএসএনএল সংক্রান্ত বেশ কিছু মামলার মীমাংসায় অংশ নিয়েছি। বিচারকদের সহযোগিতায় কাজটা করতে পেরে অন্য রকম অভিজ্ঞতা হল।’’
জাতীয় আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের সচিব অরিজিৎ মণ্ডল জানান, এ দিন মোট আটটি বেঞ্চে শুনানি হয়েছে। তার মধ্যে সাতটি বেঞ্চেই মহিলা সদস্য বিচারক ছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘এক দিনে ২৭৮১টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত উৎসাহজনক।’’
পুরুলিয়া জেলা আদালতের মুখ্য বিচারক সন্দীপ চৌধুরি বলেন, ‘‘বারবার শুনানির তারিখ পড়ায় অনেক সময় মানুষ আদালতের প্রতি আস্থা হারান। লোক আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। এখানে কোনও খরচ নেই। জরিমানা ও সমঝোতার ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি হয়। প্রয়োজন হলে কিস্তির সুবিধাও দেওয়া হয়।’’
প্রতি বছর মার্চ, জুন, সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বর— এই চার বার লোক আদালত বসে। তবে এ বছর মার্চ মাসে তা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। কারণ সে সময় চলছিল এসআইআর সংক্রান্ত শুনানি। শনিবারের লোক আদালতে বিভিন্ন মামলার সূত্রে প্রায় ১২ হাজার মানুষ আদালত চত্বরে উপস্থিত ছিলেন। এক দিনের এই উদ্যোগে বহু মানুষের দীর্ঘ দিনের আইনি জট কাটার পাশাপাশি আদালতের প্রতি আস্থাও যে আরও কিছুটা বেড়েছে, তা মেনে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট মহল।