শিক্ষা ব্লক

'এক গোলি, এক দুশমন! ' দেশপ্রেমের মন্ত্রে বদলে গিয়েছে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুল

রাজ্যে সরকার বদলের মতোই পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলও বদলে গেছে আগাপাশতলা। আর সেই পরিবর্তন চোখে পড়ল বিদ্যালয়ের ৮০ তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে। সৈনিক স্কুল থেকে এখন ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে পুরুলিয়ার মেয়েরাও।
'এক গোলি, এক দুশমন! ' দেশপ্রেমের মন্ত্রে বদলে গিয়েছে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুল

 


সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:


দুই ছাত্র ঘোড়ায় চড়ে একেবারে সামরিক কায়দায় নিয়ে আসছে তাদের গ্রুপ ক্যাপ্টেন তথা প্রিন্সিপাল রজনীশ কুমারকে। পিছনে গাড়িতে বসে তিনি এগিয়ে চলেছেন পতাকা উত্তোলন স্থলের দিকে। রাজ্যে সরকার বদলের মতোই পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলও বদলে গেছে আগাপাশতলা। আর সেই পরিবর্তন চোখে পড়ল বিদ্যালয়ের ৮০ তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে। সকাল সন্ধ্যে এখন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাজে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত। সৈনিক স্কুল থেকে এখন ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে পুরুলিয়ার মেয়েরাও। স্বাধীনতা দিবস উদযাপন ঘিরে তাই বদলে যাওয়া সৈনিক স্কুল নতুন করে ইতিহাস রচনার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তার ছাত্রদের শেখাচ্ছে দেশপ্রেমিক সৈনিক হওয়ার পাঠ। দেওয়ালে তারই প্রতিচ্ছবি। এক গোলি এক দুশমন।

সৈনিক স্কুলের প্রিন্সিপাল রজনীশ কুমার বলেন,"জীবনের প্রথম ও প্রধান শিক্ষা হলো শৃঙ্খলা এবং ছোট ছোট কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করার অভ্যাস। নিজের বিছানা গোছানো কিংবা কেউ না দেখলেও ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলার মতো ছোট কাজগুলোই মানুষের ভেতরে আত্মবিশ্বাস, সততা ও সত্যিকারের পেশাদারিত্ব গড়ে তোলে। ধারাবাহিক কঠোর অনুশীলন এবং মানসিক দৃঢ়তার মাধ্যমেই একদিন সাধারণ ক্যাডেটরা জাতীয় স্তরে সাফল্য অর্জন করে দেশ ও প্রতিষ্ঠানের গর্বে পরিণত হয়। আসল শৃঙ্খলা এবং চরিত্র তখনই তৈরি হয়, যখন আপনাকে কেউ দেখছে না তবুও আপনি সঠিক কাজটিই করেন"।


ছাত্র সক্ষম প্রিয়দর্শী জানায়, স্বাধীনতা দিবস হলো আমাদের জাতীয় বীরদের মহান আত্মত্যাগকে স্মরণ করার দিন।  প্রকৃত জ্ঞান অর্জন কেবল শৃঙ্খলার মাধ্যমেই সম্ভব। " গত বছরের আত্মশাসন ও দক্ষতার ভিত্তিতে ক্যাপ্টেন পদ পেয়ে সে অত্যন্ত গর্বিত এবং নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করছে।"

কীভাবে বদল এসেছে সৈনিক স্কুলে সম্প্রতি লোকসভায় সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোর প্রশ্নের উত্তরে  দেশের প্রতিরক্ষা রাষ্ট্রমন্ত্রী সঞ্জয় শেঠ জানিয়েছিলেন যে পুরুলিয়া সৈনিক স্কুলে আসন সংখ্যা বাড়ছে।২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষে  আসন বাড়ছে মোট ৬০ টি। এনডিএ- সহ সামরিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের লিখিত পরীক্ষায় ২০২১-২২-এ যেখানে সাফল্যের হার ছিল ৮.১৪ শতাংশ। সেখানে ২০২৫- ২৬-এ ওই সাফল্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে
৩৯.৫৩ শতাংশ। আগে সৈনিক স্কুলে শুধু ছাত্ররাই ভর্তি হতে পারতো। ২০২১ থেকে চিত্র বদলেছে। সংখ্যায় কম তবুও ভর্তি হচ্ছে ছাত্রীরাও। সামনেই তারা প্রথমবারের জন্য এনডিএ-র পরীক্ষার দোরগোড়ায়। পুরুলিয়ার চাষমোড়ের বাসিন্দা প্রতিভা মাহাতো স্বপ্ন দেখছে এনডিএ-তে ভর্তি হয়ে দেশের সেবা করবে। এই দেশপ্রেমের অনির্বাণ দীপ তার অন্দরে জ্বালিয়ে দিয়েছে সৈনিক স্কুল।

ছাত্রী প্রতিভা মাহাতো  জানায়, ২০২১ সালে সৈনিক স্কুলে ভর্তি হয় সে।  বর্তমানে সে একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবাও এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তাঁর থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেও সে নিজের ব্যক্তিত্ব ও শৃঙ্খলা গড়ে তুলতে এই স্কুলে যোগ দিয়েছে। সৈনিক স্কুলের প্রথম ছাত্রী ব্যাচ হিসেবে তারা এনডিএ-র প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসতে চলেছে। অসাধারণ পরিকাঠামো ও সবুজ পরিবেশে ঘেরা এই স্কুল প্রীতির জীবন বদলে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাঁর স্বপ্ন এনডিএতে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করা।

স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে বদলে যাওয়া সৈনিক স্কুল চমকে দিয়েছে। মার্চ পাস্ট তো ছিলোই ছিলো তাইকোন্ড প্রদর্শনী। ছিলো পুরস্কার বিতরণের আয়োজন। প্রিন্সিপাল হিসেবে সৈনিক স্কুলে যোগ দেওয়ার পরেই নিয়মানুবর্তিতার এক অনন্য রূপ প্রস্তুত করেন রজনীশ কুমার। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শোভিত ভারতে তৈরি প্রথম ট্যাংক বিজয়ন্ত। ১৯৬৫ ভারত পাক যুদ্ধে ভারতের জয়ে এই ট্যাংকের ভূমিকা ছিল অনন্য। এখানে রয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা ব্যবহৃত মিগ টুয়েন্টি সেভেন যুদ্ধ বিমান। বাহিনীতে বাহাদুর নামে পরিচিত এই বিমান কার্গিল যুদ্ধে ভারতকে এনে দিয়েছিল বিজয়। দেশপ্রেমের অনন্য গাথা গাইতে এই আবহ তৈরি করছে সৈনিক স্কুল। তারা তৈরি করছে ভবিষ্যতে দেশ রক্ষার দায়িত্ব নেবে যারা, এমন সব ছাত্রছাত্রীদের।