সাধারণ খবর ক্রাইম

স্বামীর মাথার দাম ২৫ লক্ষ - স্ত্রীর ১০ লাখ, মাওবাদী জীবন ছেড়ে আত্মসমর্পণ দম্পতির

বাংলা-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা আঞ্চলিক কমিটির সেই মাওবাদী নেতা রামপ্রসাদ মান্ডি ওরফে শচীন ওরফে মহাদেব ওরফে সুনীল অবশেষে অস্ত্র ছাড়লেন। স্ত্রী মিতা শাহু ওরফে নয়নতারা ওরফে ঝুম্পা ওরফে পরি এবং আর এক মাওবাদী নেত্রী জবা মাহাতোর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেন শচীন।
স্বামীর মাথার দাম ২৫ লক্ষ - স্ত্রীর ১০ লাখ, মাওবাদী জীবন ছেড়ে আত্মসমর্পণ দম্পতির

 

সুইটি চন্দ্র ,পটমদা (ঝাড়খন্ড):

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কনভয়ে হামলার অভিযোগ। মাথার দাম ২৫ লক্ষ টাকা। ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ৪৪টি মামলা। বাংলা-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা আঞ্চলিক কমিটির সেই মাওবাদী নেতা রামপ্রসাদ মান্ডি ওরফে শচীন ওরফে মহাদেব ওরফে সুনীল অবশেষে অস্ত্র ছাড়লেন। বুধবার বাঁকুড়া পুলিশ লাইনের কনফারেন্স হলে রাজ্য পুলিশের এডিজি (পশ্চিমাঞ্চল)-র কাছে স্ত্রী মিতা শাহু ওরফে নয়নতারা ওরফে ঝুম্পা ওরফে পরি এবং আর এক মাওবাদী নেত্রী জবা মাহাতোর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেন শচীন। তিন জনের কাছ থেকে দু’টি ইনসাস রাইফেল, একটি একে-৪৭, ১০টি ম্যাগাজিন এবং ১৫৪ রাউন্ড কার্তুজ জমা নেওয়া হয়েছে।

প্রায় দু’দশক ধরে জঙ্গলজীবন। বাংলা ও ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলমহলে একের পর এক নাশকতার অভিযোগ।  পুরুলিয়ার বরাবাজার-বান্দোয়ান সড়ক পেরিয়ে মধুপুর, সেখান থেকে সিরকা। তার পরে ঝাড়খণ্ডের জোরসা, টুঙ্গুবুরু হয়ে পূর্ব সিংভূমের পটমদা থানার ঝুঁঝকা গ্রাম। সেখানেই শচীনের বাড়ি। অভাবের সংসার। পটমদা হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়, মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন রামপ্রসাদ। ২০০৬ সালে মাওবাদী সংগঠনে যোগ। সেই সময় বান্দোয়ান লাগোয়া পূর্ব সিংভূমের পটমদা, এমজিএম, গালুডি ও বড়াম এলাকায় সংগঠন বিস্তারের দায়িত্বে থাকা রঞ্জিত পাল ওরফে রাহুলের হাত ধরে রামপ্রসাদ হয়ে ওঠেন ‘শচীন’। অভিযোগ, সাঁকরাইল থানায় হামলা, শিলদা ইএফআর ক্যাম্পে হামলা এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে হামলার মতো একাধিক নাশকতায় তাঁর ভূমিকা ছিল।
অন্য দিকে, পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ার মেয়ে মিতা। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় মাতঙ্গিনী মহিলা সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরে ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূমের ঘাটশিলায় মাওবাদীদের সশস্ত্র স্কোয়াডে যোগ দেন। ডামপাড়া স্কোয়াডের কমান্ডারের দায়িত্বও পান। তাঁর বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ডে ১৯টি মামলা। মাথার দাম ছিল ১০ লক্ষ টাকা বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। লালগড় আন্দোলনের সময় মাওবাদী নেতা কিষেণজির ঘনিষ্ঠ শচীনের সঙ্গে মিতার পরিচয়। ২০১০ সালে পুরুলিয়ার বান্দোয়ান থানার বুড়িঝোরের জঙ্গলে তাঁদের ‘কমরেড ম্যারেজ’।

২০১১ সালে কিষেণজির মৃত্যুর পরে জঙ্গলমহলে যৌথবাহিনীর অভিযান বাড়ে। বার বার জায়গা বদল করতে করতে শচীন-মিতা পৌঁছান ঝাড়খণ্ডের সারান্ডার গভীর জঙ্গলে। ২০১৮ সাল থেকে পূর্বাঞ্চলীয় হেডকোয়ার্টার ঘিরে থাকা দুর্গম এলাকায় তাঁদের থাকার কথা জানতে পারে পুলিশ। সেখানেও দীর্ঘদিন যৌথবাহিনীর অভিযানের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে সারান্ডা থেকে মাওবাদীদের বেঙ্গল ব্রিগেডের একটি সশস্ত্র দল দলমা পাহাড়ের দিকে রওনা দেয় বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর। প্রায় ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি জঙ্গলপথ পেরিয়ে, বহু পাহাড় ডিঙিয়ে জুলাইয়ের শেষে তারা দলমায় পৌঁছান। ওই দলে শচীন-মিতা-সহ ১১ জন ছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে খবর। পরে কয়েক জন গ্রেফতার হন। শচীন-মিতা-সহ অন্যেরা কিছু দিন গোপন ডেরায় থেকে যান।
এর মধ্যেই বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে যৌথবাহিনীর তল্লাশি এবং ধারাবাহিক অভিযানে চাপ বাড়তে থাকে। রোলাহাতু পাহাড়ের জঙ্গল থেকে মাওবাদীদের অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধারের পর নজর আরও বাড়ে সীমান্তবর্তী এলাকায়। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছরের সশস্ত্র জীবন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন শচীন ও মিতা। বুধবার বাঁকুড়ায় অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন তাঁরা। রাজ্য পুলিশের তরফে তাঁদের পুনর্বাসন প্যাকেজের আওতায় আনার জন্য স্ক্রিনিং কমিটির কাছে আবেদন করা হবে।

শচীনের মা পানসরি মান্ডি বলেন,"চোখে দেখিনি বৌমাকে। এই কয়েকটা বছরে পুলিশের কাছে কত যে বৌমার কথা শুনেছি। এবার চোখে দেখবো। তার হাতের রান্না খাওয়ার অপেক্ষায় আমরা রয়েছি।"
"
বাবা সনাতন মান্ডি বলেন,"ছেলে যে  বিয়ে করেছে, ওই বিয়েতে কি বাবা-মা উপস্থিত ছিল?  নাকি কোন আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত ছিল? বিয়ে করেছে আর কী করা যায়! বৌমাকে আমরা মেনে নেবো।"

শচীনের ভাই ছুটুলাল মান্ডি জানান,
"দাদা বাড়ি আসবে। সঙ্গে বৌদি থাকবে। এ যে কত আনন্দের বলে বোঝাতে পারবো না। "

এক সময় যে জঙ্গল শচীন-মিতাদের আশ্রয় ছিল, সেই জঙ্গলই এ বার তাঁদের পিছনে। সামনে অস্ত্রহীন জীবনে ফেরার নতুন অধ্যায়।