নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:
২০২৭ সালের ভারতীয় জনগণনার আগে জঙ্গলমহলের কুড়মি জনজাতিদের মধ্যে একটি নিবিড় প্রচার শুরু করেছিল আদিবাসী কুড়মি সমাজ। তাদের মূল বার্তা ছিল, জনগণনায় জাতি হিসেবে 'কুড়মি', ভাষা হিসেবে 'কুড়মালি' এবং ধর্ম হিসেবে 'সারনা' লিখতে হবে। কিন্তু জনগণনার প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা যায়, কুড়মালি ভাষার জন্য নির্দিষ্ট কোনও পৃথক কোড রাখা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের অধিকার ও পরিচিতি সুনিশ্চিত করতে সরাসরি দেশের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেন্সাস কমিশনারের দ্বারস্থ আদিবাসী কুড়মি সমাজের কেন্দ্রীয় কমিটি।
সম্প্রতি দিল্লিতে সেন্সাস কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি জমা দিতে কুড়মি সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাত, জামশেদপুরের সাংসদ বিদ্যুৎবরণ মাহাত এবং গিরিডির সাংসদ চন্দ্রপ্রকাশ চৌধুরি। প্রতিনিধিদলের মূল দাবি, আসন্ন জনগণনায় কুড়মালি ভাষার জন্য একটি সম্পূর্ণ পৃথক কোড বরাদ্দ করতে হবে। বর্তমানে ভাষার তালিকায় 'কুড়মালিঠার' লেখা থাকলেও, সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে এর সঙ্গে 'কুড়মালি' শব্দটি স্পষ্টভাবে যুক্ত করার আবেদন জানানো হয়েছে।
শুধু ভাষার স্বীকৃতিই নয়, সেন্সাস কমিশনারের কাছে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছেন তাঁরা। আদিবাসী কুড়মি সমাজের বক্তব্য, জনগণনায় মন্দির, মসজিদ বা গির্জা গণনা করা হলেও তাদের পবিত্র উপাসনালয় গণনা করা হচ্ছে না। তাই গণনার তালিকায় তাদের নিজস্ব ধর্মীয় স্থান 'গরাম থান'-কে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি, তফশিলি জাতি (এসসি) ও উপজাতিদের (এসটি) মতো অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিদের (ওবিসি) কেন গণনা করা হচ্ছে না, সেই প্রাসঙ্গিক প্রশ্নও তাঁরা তুলেছেন।
রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক তথা পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাত, জামশেদপুরের বিজেপি সাংসদ বিদ্যুৎবরণ মাহাত ও গিরিডির আজসু দলের সাংসদ চন্দ্রপ্রকাশ চৌধুরিকে সঙ্গে নিয়ে কুড়মি সমাজের এই কেন্দ্রীয় পদক্ষেপ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, কুড়মিদের নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ভাষা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কুড়মালি ভাষা স্বীকৃতি পেয়েছে এবং এই ভাষায় নিয়মিত পঠন-পাঠন চলছে। এই ভাষার নিজস্ব লোকসাহিত্যও যথেষ্ট সমৃদ্ধ।
ভাষার কোড না থাকার বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাত বলেন, "আমরা দেখেছি পৃথক জাতিসত্তা ও ভাষা থাকা সত্ত্বেও ভাষার কোডের অভাবে জনগণনাতে কুড়মি জনজাতির প্রকৃত জনসংখ্যা এবং তাদের ভাষাগত ও জাতির প্রকৃত পরিচয় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংরক্ষণ, ও উন্নয়নমূলক নীতি নির্ধারণেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়"। এই কারণেই ২০২৭ সালের জনগণনায় স্বতন্ত্র কুড়মালি ভাষার পৃথক কোড সংযোজন করে সব রাজ্যের সেন্সাস কর্তৃপক্ষকে যথাযথ নির্দেশিকা পাঠানোর আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা।
দিল্লিতে প্রশাসনিক স্তরে দাবি জানানোর পাশাপাশি, স্থানীয় স্তরেও ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে কুড়মি সমাজ। গ্রামে গ্রামে প্রশাসনিক আধিকারিকদের জনগণনার কাজে সহায়তা করতে জঙ্গলমহলের চার জেলা, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং মেদিনীপুর জুড়ে 'সাঁউতা দহগি' নামে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। জনগণনায় যাতে কুড়মিদের জাতি, ভাষা এবং ধর্ম সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হয়, তা সুনিশ্চিত করাই এই কমিটির প্রধান লক্ষ্য। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জঙ্গলমহলের এই চারটি জেলায় প্রায় ৪ হাজার কুড়মি অধ্যুষিত গ্রাম রয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র পুরুলিয়াতেই এই ধরনের গ্রামের সংখ্যা সর্বাধিক, প্রায় ১৪০০।