অন্যান্য ব্লক

জানালেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী, জঙ্গলমহলে প্রথম অভয়ারণ্যর অনুমোদন এখন সময়ের অপেক্ষা

রবিবার পুরুলিয়ায় প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, অভয়ারণ্য তৈরির অনুমোদনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। বন দফতরের আশা, চলতি আর্থিক বছরেই এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি হতে পারে।
জানালেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী,  জঙ্গলমহলে প্রথম অভয়ারণ্যর অনুমোদন এখন সময়ের অপেক্ষা


 

সুইটি চন্দ্র ও শুভদীপ মাহাত, কোটশিলা ও ঝালদা :

ভিটেমাটি ছাড়তে হবে না। মানুষকে সঙ্গে নিয়েই জঙ্গলমহলে তৈরি হতে চলেছে পুরুলিয়ার প্রথম অভয়ারণ্য। কোটশিলা ও ঝালদা বনাঞ্চলের ২১টি মৌজা জুড়ে ৩৬০৯.৪০ হেক্টর এলাকায় প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পের অনুমোদন এখন সময়ের অপেক্ষা। রবিবার পুরুলিয়ায় প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, অভয়ারণ্য তৈরির অনুমোদনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। বন দফতরের আশা, চলতি আর্থিক বছরেই এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি হতে পারে।

সাধারণত অভয়ারণ্য বা সংরক্ষিত বনাঞ্চল তৈরির ক্ষেত্রে বসতি সরানো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু পুরুলিয়ার ক্ষেত্রে সেই পথে হাঁটছে না রাজ্য। একটিও গ্রাম স্থানান্তর না করেই বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। গত চার বছর ধরে চিতাবাঘের আক্রমণে গবাদি পশুর ক্ষতি হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষোভ দেখা যায়নি। বন্যপ্রাণের সঙ্গে এই সহাবস্থান ও স্থানীয় মানুষের সহনশীলতাকেই প্রকল্পের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অভয়ারণ্য তৈরির বিস্তারিত রিপোর্ট ইতিমধ্যেই অরণ্যভবনে জমা পড়েছে। প্রস্তাবিত এলাকাটি পরিদর্শন করে বিষয়টি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করেছিলেন পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘‘এই বিষয়ে আমি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করেছি। বিষয়টি প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পুরুলিয়ার বনাঞ্চল এখন ভীষণ ভাবেই সমৃদ্ধ।’’ রবিবারের প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় সেই প্রক্রিয়াই আরও এক ধাপ এগোল।

ঝাড়খণ্ড সংলগ্ন কোটশিলা-ঝালদার এই বনাঞ্চল দীর্ঘদিনের হাতির করিডর। জীববৈচিত্রের দিক থেকেও এলাকা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এই জঙ্গলে রয়েছে ছ’টি পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘ, তিনটি শাবক, ১০টি স্লথ বিয়ার এবং প্রায় ৫০টি বিরল হানি ব্যাজার। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আনাগোনার স্পষ্ট প্রমাণও মিলেছে। অর্থাৎ, বাঘের স্থায়ী বাসস্থান না হলেও তার চলাচলের প্রমাণ এই জঙ্গলকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

বনাঞ্চলের উদ্ভিদ বৈচিত্রও কম নয়। কলমা বিট এলাকায় ১৮৮.২৭ হেক্টর জুড়ে রয়েছে মূল্যবান ঔষধি গাছ। হাতি, চিতাবাঘ, ভাল্লুক, হানি ব্যাজার-সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণের পাশাপাশি এই উদ্ভিদসম্পদও প্রস্তাবিত অভয়ারণ্যের সংরক্ষণ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

শুধু সংরক্ষণ নয়, পর্যটনকেও প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার লক্ষ্যে জিপসি সাফারি, ট্রেকিং রুট, রক ক্লাইম্বিং, প্রজাপতি বাগান, নেচার বার্ড ট্রেইল এবং প্রকৃতি পাঠশালার মতো পরিকাঠামো তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ, গবেষণা এবং নজরদারির কাজে স্থানীয় ১৫টি যৌথ বন পরিচালন কমিটিকেও যুক্ত করা হবে। ফলে স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে নয়, তাঁদের অংশীদার করেই অভয়ারণ্য পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

সেঁওয়াতি জলপ্রপাত এবং সংলগ্ন শিব মন্দির এলাকাতেও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মতি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, পর্যটনের প্রসার ঘটলেও তার সঙ্গে বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ভারসাম্য রাখার লক্ষ্য রয়েছে প্রশাসনের।

জঙ্গল ও বন্যপ্রাণ সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাও এই সহাবস্থানের ছবিটা স্পষ্ট করে। এলাকার বাসিন্দা সোমবারি বেশরার কথায়, ‘‘জঙ্গলে বলে বহুত রকম জানোয়ার থাকে, সাপ থাকে, ভাল্লুক থাকে, ঠাকুর... মানে হাতি ঠাকুর থাকে।’’ আবার রাখাল শম্ভু কিস্কুর অভিজ্ঞতা, ‘‘চিতাবাঘকে তো দেখি নাই, তবে জঙ্গলে গরু চরাতে গিয়ে ভালুক দেখেছি।’’

এই অভিজ্ঞতা, বন্যপ্রাণের সমৃদ্ধি এবং মানুষের দীর্ঘদিনের জঙ্গলনির্ভর জীবনযাত্রাকে সঙ্গে নিয়েই তৈরি হতে চলেছে পুরুলিয়ার প্রথম অভয়ারণ্য। ২১টি মৌজার বিস্তীর্ণ বনভূমিতে নতুন সংরক্ষণ কাঠামো তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের ভিটেমাটি অক্ষুণ্ণ রাখাই এই প্রকল্পের অন্যতম বিশেষত্ব।