সাধারণ খবর ব্লক

রেল টেকায় কুড়মিদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী

রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি রেল পুলিশও মামলা করে। মোট তিনটি মামলা দায়ের হয়। গ্রেফতার হন ৫১ জন। তাঁদের মধ্যে ২৯ জনকে গ্রেফতার করে পুরুলিয়া জেলা পুলিশ। আরপিএফের হাতে ধরা পড়েন আরও ২২ জন।
রেল টেকায় কুড়মিদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী

 


নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:

জঙ্গলমহল জুড়ে এক সময় উঠেছিল ‘নো ভোট টু টিএমসি’-র ডাক। কেন, মনে আছে? নেপথ্যে ছিল কুড়মিদের জাতিসত্তার আন্দোলন ঘিরে ক্ষোভ। অভিযোগ ছিল, আন্দোলনের সময় রেল অবরোধকে কেন্দ্র করে কুড়মি নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ মামলা দিয়েছিল তৎকালীন তৃণমূল সরকার। সেই সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করা হবে, রবিবার পুরুলিয়ার কড়াডিতে কুড়মিদের করম পার্বণের মঞ্চ থেকে প্রকাশ্যেই ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে এই সিদ্ধান্ত নতুন নয়। এ কথা মুখ্যমন্ত্রী আগেই প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন। গত ২১ মে দুর্গাপুরে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিকে নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠকে আধিকারিকদের সমস্ত মামলা প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর।

প্রতি বছর জাতিসত্তার দাবি নিয়ে ২০ সেপ্টেম্বর কুড়মিদের রেল অবরোধ কর্মসূচি হত।  এস.টি তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্তির দাবিতে ওই দিন রেল টেকা আন্দোলন  করতেন তারা । ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বরও দুর্গাপুজোর ঠিক আগে একই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।  কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে রেল অবরোধকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘বেআইনি’ বলা হয়।  আদালতের নির্দেশের পরে অবরোধ ঠেকাতে পুরুলিয়া জেলা পুলিশ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কুড়মি নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় এবং পুলিশের উপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
ঘটনায় রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি রেল পুলিশও মামলা করে। মোট তিনটি মামলা দায়ের হয়। গ্রেফতার হন ৫১ জন। তাঁদের মধ্যে ২৯ জনকে গ্রেফতার করে পুরুলিয়া জেলা পুলিশ। আরপিএফের হাতে ধরা পড়েন আরও ২২ জন।

তবে ২০২৫-এর ঘটনাই প্রথম নয়। আগের বছরগুলিতেও ২০ সেপ্টেম্বরের রেল অবরোধকে কেন্দ্র করে আরপিএফ মামলা করেছিল। আন্দোলনের জেরে বিভিন্ন স্টেশনে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও উঠেছিল। প্রতি বছর একই দিনে এস.টি তালিকাভুক্তির দাবিতে রেল অবরোধ কুড়মি আন্দোলনের অন্যতম কর্মসূচি হয়ে উঠেছিল। রাজ্যে পালাবদলের পরে অবশ্য সেই পরিস্থিতিতে বদল এসেছে বলে কুড়মি সংগঠনটির বক্তব্য। কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার কথা  সরকার ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি, কুড়মিদের অন্যতম প্রধান দাবি পুনরায় এস.টি তালিকাভুক্তির বিষয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে আশ্বাস মিলেছে বলে কুড়মি নেতাদের দাবি।

আদিবাসী কুড়মি সমাজের প্রধান নেতা অজিত প্রসাদ মাহাতো  বলেন, "বিগত সরকার কুড়মি সমাজকে কেবল মিথ্যা আশ্বাসই দিয়েছে এবং তাদের ওপর হওয়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। মামলা-মোকদ্দমা এবং সমস্ত নির্যাতনের জবাব দিতেই 'নো ভোট টু টিএমসি' আন্দোলন এবং জাতিসত্তা রক্ষার লড়াই শুরু হয়েছিল। কুড়মি জাতিকে এস.টি তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা, কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে যুক্ত করা এবং আন্দোলনকারীদের ওপর হওয়া মিথ্যা কেস-মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করার দাবি আমাদের এখনো জারি রয়েছে"।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "বিগত সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি রাখেনি; উল্টে আপনাদের আন্দোলনে পুলিশ নামিয়ে বৃদ্ধ থেকে শিশু সবার ওপরেই অত্যাচার ও মিথ্যা মামলা চালিয়েছিল। অজিত বাবুর নেতৃত্বে আপনারা ঠিক করেছিলেন, যে দল কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে স্বীকৃতির আশ্বাস দেবে, তাকেই বিধানসভায় সমর্থন করবেন। তাই দুর্গাপুরের মিটিংয়ের মতোই আজও আপনাদের নিশ্চিত করছি, আন্দোলনকারীদের ওপর হওয়া সমস্ত মামলা আমরা তুলে নেব"।

এবার দীর্ঘদিনের রেল অবরোধের কর্মসূচি থেকে সরে এসে নিজস্ব সংস্কৃতিকে নিয়ে জড়ো হয়েছিল কুড়মি সমাজ। আর সেই প্রেক্ষাপটেই পুরনো মামলাগুলি প্রত্যাহারের মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।