ব্লক আমার জন্মভূমি

একরাতে কংসাবতীর বন্যা এক করে দিয়েছিলো তুম্বা আর ঝালদা দুই গ্রামকে

এক রাতের ভয়াবহ বন্যায় তুম্বা গ্রাম জলের তলায় ডুবে যায়। গ্রামবাসীরা পালিয়ে আশ্রয় নেন ঝালদায়। তারপর থেকেই গ্রামের নামকরণ হয় তুম্বাঝালদা।
একরাতে কংসাবতীর বন্যা এক করে দিয়েছিলো তুম্বা আর ঝালদা দুই গ্রামকে

 

দেবীলাল মাহাতো


কোটশিলার জাবর পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে তিরতির করে বয়ে চলেছে কংসাবতী নদী। সেই নদীর দু'পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য জনপদ। তেমনি একটিই জনপদ হল আড়শা ব্লকের বেলডি গ্রাম পঞ্চায়েতের তুম্বাঝালদা। প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসাবে পরিচিত গ্রামটি। খেজুর,পলাশ গাছ ঘেরা সবুজের সমারোহে গ্রামটি আজও ধরে রেখেছে তার নিজস্বতা। আধুনিকতার যুগে আজও তা অমলিন।

গ্রামের দুর্গা মন্দির।

 

 

পুরুলিয়া -আড়শা ভায়া বেলডি রাস্তা থেকে দু'কিলোমিটার দূরেই অবস্থান করছে গ্রামটি। গ্রামের ছোট বড়ো মিলে ৭টি পাড়ায় প্রায় ৫০০ টি পরিবারের বসবাস। বর্তমানে গ্রামে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১৮০০। মাহাত, ব্রাহ্মণ, পরামানিক, সহিস,দাস সহ মুসলিমদেরও বসবাস রয়েছে গ্রামে। গ্রামটির উত্তরে কংসাবতী নদী, দক্ষিণে বীরচালি, পূর্বে গৌরাদাগ ও পশ্চিমে বামুনডিহা । অতীতে এই গ্রাম ছিল কাশিপুর ও চাকলতোড়ের পঞ্চকোট রাজবংশের রাজাদের অধীনস্থ। রাজবংশের উত্তরসূরীরাও বেশ কয়েক বছর এই গ্রামে বসবাস করেছিল।

দেউলবেড়াতে নবনির্মিত মন্দির।

গ্রামের নামকরণ নিয়ে নানা মত রয়েছে। গ্রামবাসীরা জানান,আগে গ্রামের নাম ছিল ঝালদা। উত্তর প্রান্তে কংসাবতী নদীর গা ঘেঁষে ছিল তুম্বা নামে আরেকটি বসতি। জনশ্রুতি ,এক রাতের ভয়াবহ বন্যায় তুম্বা গ্রাম জলের তলায় ডুবে যায়। গ্রামবাসীরা পালিয়ে আশ্রয় নেন ঝালদায়। তারপর থেকেই গ্রামের নামকরণ হয় তুম্বাঝালদা। গ্রামের উত্তর প্রান্তে তুম্বাঝালদা মৌজায় দেউলবেড়াতে গড়ে উঠেছিল জৈন পীঠস্থান। সেখানে একসময় দেউলঘাটার মতো তিনটি দেউল ছিল। ছিল দুষ্প্রাপ্য প্রাচীন মূর্তি সহ অনেক ধনসম্পদ। প্রবীণ বাসিন্দারা জানান,  প্রায় ৫০ বছর আগে ধনসম্পদের আশায় হাতির পিঠে চড়ে তিন সাধু আসেন। তাঁরা ছয় সাত দিন দেউলবেড়াতে থেকে একদিন রাতে দেউল খনন করে সমস্ত ধনসম্পদ নিয়ে চলে যান । পরে ১৯৯২ সালের  বন্যায় তিনটি দেউল তলিয়ে যায়। গ্রামবাসীরা কয়েকটি মূর্তি উদ্ধার করে গ্রামে নিয়ে আসেন।

দেউলবেড়ার প্রাচীন মূর্তি।

গ্রামবাসীরা উদ্যোগী হয়ে সেই মূর্তি আবার তুম্বাঝালদা থেকে দেউলবেড়াতে নিয়ে আসেন।২০১৬ সালে নির্মিত নতুন মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তারপরেই স্বেচ্ছাশ্রমে তৈরি করা হয় দেউলবেড়া যাওয়ার রাস্তা। প্রতিবছর ওই মন্দির লাগোয়া মাঠে 'দেউলবেড়া দশগ্রাম মেলা কমিটি'র উদ্যোগে বসে পৌষমেলা ও বারুনি মেলা । সে এক মিলন মেলা। মেলায় থাকে অভিনবত্বের ছোঁয়া। মেলা কমিটির সম্পাদক চিত্তরঞ্জন মাহাতো জানান, "সকলের চেষ্টায় দেউলবেড়ার হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি।"

শিক্ষা সংস্কৃতির দিক থেকেও সুনাম রয়েছে গ্রামটির। সারা বছর ধরে গ্রামে ছৌনাচ, যাত্রা সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় । একসময় গ্রামে তিনটি ছৌনাচের দল ছিল। গ্রামে রয়েছে দুটি দুর্গা মন্দির। জুরাডি, বামুনডিহা সহ আশেপাশের গ্রামের মানুষ তাতে যোগ দেন। রয়েছে  দুটি হরিমন্দির, শিবমন্দির। বৈশাখ মাসে বসে শিবের গাজন ও মেলা। মেলার মূল আকর্ষণ 'আলকাপ '। গ্রামে রয়েছে শতবর্ষ প্রাচীন বিষ্ণু মন্দির। তবে সেই মন্দির ধ্বংসের পথে। খেলাধুলা চর্চায় খ্যাতি রয়েছে গ্রামের ছেলে মেয়েদের। সেই ধারা আজও বহমান।

শতাব্দী প্রাচীন বিষ্ণু মন্দির।

বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে গ্রামবাসীদের। তার মধ্যে অন্যতম হল পানীয় জল। গ্রামে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের উদ্যোগে পানীয় জলের প্রকল্প গড়ে উঠলেও সকলে জল পান না। প্রাচীন গ্রাম হলেও জলসেচের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি গ্রামে। গ্রামের সন্নিকটেই কংসাবতী নদীতে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে সেতুর কাজ। সেতুটি হলে সহজেই উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে যেতে পারবেন তাঁরা। পাশাপাশি পঞ্চায়েত এলাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্সের দাবি জানান গ্রামবাসীরা।

▪️▪️▪️

চিত্তরঞ্জন মাহাত
চিত্র শিল্পী, তুম্বাঝালদা


আমার কাছে গ্রাম শুধু জন্মভূমি নয়। এটা অনুভূতির একটা জায়গা। গ্রামের কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধুলো মাখা কাঁচা রাস্তা ,খালি পায়ে ছুটোছুটি, বন্ধুদের কলরব, বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে যাওয়া, ফেরার পথে পুকুরে ঢিল ছোড়া আর সন্ধ্যা নামলেই বয়স্কদের কাছ থেকে 'রাত কাহানি'র গল্প শোনা। গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই আমার মধ্যে শিল্পী ছোঁয়া এনে দিয়েছে। গ্রামকে ভালবাসতে শিখিয়েছে।
আমার জন্মভূমি হয়তো মানচিত্রে ছোট্ট একটা বিন্দু। কিন্তু আমার চোখে সেটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঠিকানা। কারণ ওখানেই আমার শিকড়, আমার ছেলেবেলা, আমার শিল্পী হওয়ার অনুপ্রেরণা।

▪️▪️▪️

 


অম্বরীশ মাহাত 
গ্রামের বাসিন্দা


আমার জন্মভূমি আমার কাছে গর্বের আশ্রয়।  গ্রামের প্রকৃতির মতো সুন্দর ও নিরাপদ জায়গা আর কোথাও নেই। তবে দিন দিন গ্রামের নিজস্বতা হারিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতির কল্যাণে, তথাকথিত উন্নয়নের দাপটে, মিডিয়া ইন্টারনেট সহ চটুল গানের দাপটে গ্রাম তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। সন্ধ্যা নামলেই লোক সংস্কৃতির নান্দনিক চর্চা কমে আসছে। ছৌনাচ, আলকাপ, যাত্রার রিয়ার্সাল চলতো তা এখন  ফিকে হয়ে আসছে। তবে গ্রামের গর্বের একটা অংশ দেউলবেড়া। গ্রামের সকলেই গরিমাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু গ্রামবাসীদের চেষ্টায় হবে না। প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি পড়লে , সঠিক পরিকল্পনা ও প্রচার হলে অচিরেই পুরুলিয়ার পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নেবে দেউলবেড়া।
উন্নয়ন দরকার, কিন্তু উন্নয়নের নামে গ্রামের শিকড় যেন না উপড়ে যায়। গ্রাম থাকুক গ্রামের মতো। তার ভাষা, গান, মেলা, মানুষ এই নিয়েই আমার জন্মভূমি।