সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:
প্রায় দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর ফের গতি পেয়েছে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের প্রকল্প। এই মাসেই পশ্চিমবঙ্গে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প (মানরেগা) চালু হয়েছে। তার মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন আইন 'বিকশিত ভারত–রোজগার ও আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ) আইন ২০২৫ কার্যকর হতে চলেছে আগামী ১ জুলাই থেকে।
নতুন আইনে গ্রামীণ পরিবারের জন্য বছরে ১০০ দিনের বদলে ১২৫ দিনের মজুরিভিত্তিক কাজের গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে। পুরুলিয়া জেলার পরিসংখ্যান বলছে, এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনে। জেলার ২০টি ব্লক ও ১৭০টি গ্রাম পঞ্চায়েতে মোট নিবন্ধিত জবকার্ডের সংখ্যা ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ২৫৫। মোট শ্রমিকের সংখ্যা ১১ লক্ষ ২১ হাজার ৯৩১। এর মধ্যে তফসিলি জাতিভুক্ত শ্রমিক ২ লক্ষ ৩১ হাজার ৪৮১ জন, তফসিলি উপজাতিভুক্ত শ্রমিক ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৪৬৯ জন এবং অন্যান্য শ্রেণির শ্রমিক ৬ লক্ষ ৬০ হাজার ৯৮১ জন।
নতুন আইনে শুধু কর্মদিবস বাড়ানোই নয়, গ্রামীণ পরিকাঠামো নির্মাণেও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। চারটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে— জল সংরক্ষণ, মূল গ্রামীণ পরিকাঠামো, জীবিকা-সম্পর্কিত পরিকাঠামো এবং চরম আবহাওয়া মোকাবিলার বিশেষ প্রকল্প। একই সঙ্গে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি, ফেস অথেন্টিকেশন, জিও-স্পেশিয়াল পরিকল্পনা এবং সামাজিক নিরীক্ষার মতো ব্যবস্থাও আরও কঠোর করা হচ্ছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ভবিষ্যতে এনএমএমএস মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিদিন ফেস অথেন্টিকেশনের ভিত্তিতে শ্রমিকদের উপস্থিতি নথিভুক্ত হবে। সেই কারণে ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুরুলিয়ায় ইতিমধ্যেই ৮ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৬৩ জন শ্রমিকের ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট শ্রমিকের প্রায় ৭৫.৭২ শতাংশ।
অন্যদিকে, গ্রামীণ আবাসন ক্ষেত্রেও বড় কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ৪ জুন থেকে ৪ অগস্ট পর্যন্ত জেলার ১৭০টি গ্রাম পঞ্চায়েতে চলছে আবাসপ্লাস সমীক্ষা-২০২৪। এআই-ভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ এবং আধার-সংযুক্ত ফেস অথেন্টিকেশনের মাধ্যমে এই সমীক্ষা করা হচ্ছে। গৃহহীন ও কাঁচা বাড়িতে বসবাসকারী যোগ্য পরিবারগুলিকে চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (গ্রামীণ)-র আওতায় আনা হবে। প্রকল্পে প্রতিটি যোগ্য পরিবারকে ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে তিনটি কিস্তিতে।
জেলা প্রশাসনের একাংশের মতে, একদিকে আবাসন সমীক্ষা, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান আইন— এই দুই উদ্যোগ মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। বিশেষত পুরুলিয়ার মতো জেলায়, যেখানে ১০ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক এনরেগার সঙ্গে যুক্ত, সেখানে আগামী ১ জুলাইয়ের পর নতুন আইনের বাস্তবায়ন গ্রামীণ উন্নয়নের ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
রবিবার সাংবাদিক সম্মেলনে পুরুলিয়ার জেলা শাসক সুধীর কোন্থাম মূলত তিনটি বিষয় সামনে আনেন। ভিবি জি রাম জি প্রকল্পের খুঁটিনাটি ছাড়াও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা ও বিশ্ব যোগ দিবসের কথা।
তিনি বলেন, "ভিবি-জি রাম জি প্রকল্প গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এই প্রকল্পের প্রতিটি কাজ সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে অনলাইনের মাধ্যমে ট্র্যাক করা হবে। পুরুলিয়া জেলার ২০টি ব্লকের ১৭০টি গ্রাম পঞ্চায়েতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। বর্তমানে জেলায় ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ২৫৫টি জব কার্ড রয়েছে এবং এই জব কার্ডগুলির মাধ্যমে প্রায় ১১ লক্ষ ২১ হাজার ৯৩১ জন শ্রমিক কাজের সুযোগ পেতে পারেন।
আমরা প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতের স্থানীয় চাহিদা এবং পিএম গতিশক্তি পোর্টালের তথ্যের ভিত্তিতে 'বিকশিত গ্রাম পঞ্চায়েত প্ল্যান' তৈরি করব। সেই পরিকল্পনা 'যুক্তধারা পোর্টাল'-এ নথিভুক্ত হবে এবং সেই অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগোবে। এই কর্মসূচিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আর্থিক অংশীদারিত্ব থাকবে ৬০:৪০ অনুপাতে, যা মজুরি এবং উপকরণ—উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বর্তমানে প্রায় ৭৫ শতাংশ সুবিধাভোগীর ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন হয়েছে। আমরা চাই দ্রুত ১০০ শতাংশ ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ হোক, কারণ প্রকল্পে কাজ পাওয়ার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই, ২০২৬ থেকে এই প্রকল্প কার্যকরভাবে চালু হবে।
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-গ্রামীণ প্রকল্পে এমন মানুষদের চিহ্নিত করা হচ্ছে, যাঁরা এখনও গৃহহীন অথবা কাঁচা ও অনুন্নত ঘরে বসবাস করছেন। যাঁরা বিভিন্ন কারণে এতদিন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বা সরকারি পোর্টালে অভিযোগ জানিয়েছেন, তাঁদের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যাতে সহজে আবেদন করতে পারেন, তার জন্য গুগল প্লে স্টোরে থাকা আবাস প্লাস অ্যাপের মাধ্যমে স্ব-জরিপের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই প্রকল্পে কারা সুবিধা পাবেন না, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। যাঁদের পাকা বাড়ি আছে, দুটির বেশি ঘর রয়েছে, সরকারি চাকরি করেন, আয়কর দেন অথবা ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিক, তাঁরা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন না। অন্যদিকে কাঁচা, বাঁশ, কাদা কিংবা না-পোড়ানো ইটের তৈরি বাড়িতে বসবাসকারী পরিবারগুলি আবেদন করতে পারবেন।
সমীক্ষা ও প্রশাসনিক অনুমোদনের পর প্রতিটি যোগ্য পরিবারকে তিন দফায় মোট ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। প্রথম কিস্তিতে ৬০ হাজার টাকা, দ্বিতীয় কিস্তিতে আরও ৬০ হাজার টাকা এবং বাড়ি সম্পূর্ণ হওয়ার পর শেষ কিস্তিতে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হবে।
আগামী ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবস জেলা ও রাজ্য স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হবে। আমরা চাই এই কর্মসূচি শুধুমাত্র একটি দিনের অনুষ্ঠান হয়ে না থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠুক। সেই কারণেই যোগ দিবসের আগে ১৪ দিনের একটি ধারাবাহিক প্রস্তুতি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাইকেল র্যালির মাধ্যমে সচেতনতা অভিযান শুরু হয়েছে। ৮ জুন সরকারি কর্মচারী ও আধিকারিকদের জন্য যোগাভ্যাসের বিশেষ কর্মসূচি থাকবে। ১১ জুন 'যোগা ও নারী স্বাস্থ্য' বিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান হবে। ১২ জুন পুরুলিয়া-সহ জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে বিশেষ যোগাভ্যাসের আয়োজন করা হবে। এছাড়া পুলিশ, বনদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং অন্যান্য ইউনিফর্ম সার্ভিসের কর্মীদের জন্য পৃথক কর্মসূচি থাকবে। ১৯ জুন 'যোগা রান' এবং ২০ জুন জেলার প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত, পুরসভা ও ওয়ার্ডে সাধারণ মানুষের জন্য যোগ শিক্ষার আয়োজন করা হবে। ২১ জুন জেলার সর্বত্র একযোগে 'কমন যোগা প্রোটোকল' অনুযায়ী ৪৫ মিনিটের যোগাভ্যাস অনুষ্ঠিত হবে।
এই কর্মসূচি সফল করতে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বর্তমানে জেলায় ৩৯ জন প্রশিক্ষিত যোগ ইন্সট্রাক্টর রয়েছেন। এছাড়া সমস্ত সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কমিউনিটি হেলথ অফিসার, মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভিন্ন স্তরে যোগ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করবেন।
বর্তমানে হার্টের রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, স্থূলতা-সহ অসংক্রামক ব্যাধির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইসঙ্গে মানসিক উদ্বেগ, অবসাদ ও চাপও মানুষের জীবনে বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। নিয়মিত যোগাভ্যাস এই সমস্যাগুলি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে যদি ছোটবেলা থেকেই স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগের অভ্যাস গড়ে তোলা যায়, তাহলে আগামী দিনে তারা আরও সুস্থ, কর্মক্ষম ও মানসিকভাবে শক্তিশালী নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। আমাদের লক্ষ্য, যোগকে একটি গণআন্দোলনের রূপ দেওয়া এবং জেলার সর্বস্তরের মানুষকে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা।"