শুভদীপ মাহাত, পুরুলিয়া:
লাল মাটির দেশ পুরুলিয়া। আর সেই রুক্ষ মাটির বুকেই এবার রচিত হলো এক বিশ্বজয়ের গৌরবগাথা। ‘গণিতের নোবেল’ খ্যাত ফিল্ডস মেডেলের মঞ্চে এবার সগর্বে উচ্চারিত হবে পুরুলিয়ার নাম। আমেরিকার মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনে গবেষণাপত্র পেশ করার বিশেষ আমন্ত্রণ পেলেন পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডঃ গোরাচাঁদ চক্রবর্তী। তাঁর এই অসামান্য সাফল্যে আজ পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গ তথা সমগ্র ভারতবর্ষ গর্বিত।
এই গুণী গণিতবিদের শিক্ষাজীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে সাফল্যের সুবাস। ২০১০ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ পুরুলিয়ার জে. কে. কলেজ থেকে গণিতে সাম্মানিক স্নাতক হন তিনি। এরপর মেধার উজ্জ্বল পথ ধরে এগিয়ে ২০১২ সালে আইআইটি গুয়াহাটি থেকে গণিত ও পরিগণন বিদ্যায় (কম্পিউটিং) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। নিরলস সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্জন করেন তাঁর পিএইচডি উপাধি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার পেনসিলভ্যানিয়া কনভেনশন সেন্টারে বসতে চলেছে আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনের এক মহামিলন মেলা, যেখানে ডঃ চক্রবর্তী তাঁর গবেষণাপত্র পেশ করবেন। উল্লেখ্য, এই সম্মেলন হলো বিশ্বের গণিত গবেষণার সর্বোচ্চ আসর। প্রতি চার বছর অন্তর এই সম্মেলনেই প্রদান করা হয় বিশ্বখ্যাত ‘ফিল্ডস মেডেল’, যা গোটা বিশ্বের কাছে ‘গণিতের নোবেল’ নামেই সমধিক পরিচিত। সারা পৃথিবী থেকে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন গবেষকই এমন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের কাজ তুলে ধরার বিরল সুযোগ পান। সেই নির্বাচিত গবেষকদের তালিকায় ডঃ গোরাচাঁদ চক্রবর্তীর নাম স্থান পাওয়ায় আপামর পুরুলিয়াবাসী আজ আনন্দে উদ্বেলিত।
নিজের গবেষণার মূল বিষয় নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "জটিল বিশ্লেষণ বা ‘কমপ্লেক্স অ্যানালিসিস’ হলো গণিতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যা আমার গবেষণার মূল বিষয়। আমেরিকার এই আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনে আমি জটিল মানযুক্ত অপেক্ষক এবং তার গতিশীলতার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিশ্বের দরবারে তুলে ধরব"।
সহজ কথায়, জটিল গতিবিদ্যা হলো গণিতের সেই বিশেষ শাখা, যা জটিল সংখ্যা এবং জটিল সমীকরণগুলোর বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তৈরি হওয়া গতিশীল রূপ নিয়ে কাজ করে। প্রসঙ্গত, প্রখ্যাত গণিতবিদ বেনোয়া ম্যান্ডেলব্রট এই শাখাটি কাজে লাগিয়েই ‘ফ্র্যাক্টাল’ বা ভগ্নাংশিক জ্যামিতির সূচনা করেছিলেন। এই জ্যামিতির সাহায্যে মেঘ, নদী বা পর্বতমালার মতো প্রকৃতির বিচিত্র ও জটিল আকার গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া, বর্তমান যুগে কম্পিউটারের চিত্রলেখ, আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস এবং টেলিযোগাযোগের সংকেত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও এই বিদ্যার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
সম্মেলনে তাঁর নির্দিষ্ট গবেষণার দিকটি তুলে ধরে অধ্যাপক চক্রবর্তী আরও বলেন, "বিশেষ করে ‘শিফট সিউডোপিরিওডিক’ বা ছদ্ম-পর্যায়বৃত্ত অপেক্ষক, যা আসলে এক বিশেষ ধরনের মেরোমরফিক অপেক্ষক, আমি তারই কিছু গতিশীল বৈশিষ্ট্য তুলে ধরব। এর ফলে আগামী দিনে এই অপেক্ষকগুলিকে সম্পূর্ণভাবে ও আরও গভীরভাবে জানা সম্ভব হবে।"