নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝালদা:
ঝালদা পুরসভা, না কি ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’! চার বছরে পুরপ্রধানের কুর্সিতে বসেছেন আট জন। কখনও অনাস্থা, কখনও আদালতের নির্দেশ, কখনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—একটার পর একটা পালাবদলে বার বার বদলেছে পুরপ্রধানের মুখ। সেই তালিকায় এ বার নতুন সংযোজন বিজয় কান্দু। পুরপ্রধান সুরেশ আগরওয়ালের ইস্তফার পর তৈরি হওয়া অচলাবস্থা কাটিয়ে বুধবার ঝালদা পুরসভার নতুন পুরপ্রধান হিসেবে শপথ নিলেন ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার বিজয়।
পালাবদলের সঙ্গে বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণও। সদ্য তৃণমূল ছেড়ে আসা বিজয়কে এ দিন উপস্থিত আট কাউন্সিলারের সর্বসম্মতিতে পুরপ্রধান নির্বাচিত করা হয়। ছিলেন কংগ্রেস কাউন্সিলর। ছিলেন তৃণমূলেরও কাউন্সিলর। বিজেপির নেই। অবশ্য খাতায়-কলমে বিজেপির কোনও কাউন্সিলার না থাকলেও ঝালদা পুরসভার নিয়ন্ত্রণ কার্যত বিজেপির হাতেই। পুরসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি টাঙানো হয়েছে। শুভেন্দুর ছবির পাশেই পুরপ্রধানের কুর্সিতে বসেন বিজয়।
প্রাক্তন পুরপ্রধান শীলা চট্টোপাধ্যায় বলেন,"বিজেপি সব ঠিক করে দিয়েছে। ঝালদা পুরসভায় যে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, বিজয়ের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তার অবসান ঘটল। আশা করি এবার নাগরিক পরিষেবা স্বাভাবিক হবে।"
ঝালদা শহর মন্ডল বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "তৃণমূলের অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছিল, তারই জয় হলো। ঝালদার মানুষ এবার প্রকৃত উন্নয়ন দেখতে পাবেন।"
গত ২৫ জুলাই ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার তথা পুরপ্রধান সুরেশ আগরওয়াল পুরপ্রধান এবং কাউন্সিলর—দুই পদ থেকেই ইস্তফা দেন। তার পর থেকেই পুরসভায় তৈরি হয়েছিল অচলাবস্থা। ২১ আগস্ট উপপুরপ্রধানের ডাকা সভায় কোনও কাউন্সিলর উপস্থিত না থাকায় ভেস্তে যায় বৈঠক। এর পর পুরসভা সচল করতে কাউন্সিলরদের মধ্যে শুরু হয় দফায় দফায় আলোচনা ও যোগাযোগ।
বুধবার তিন কাউন্সিলরের উদ্যোগে ফের সভা ডাকা হয়। ১২ জন কাউন্সিলরের মধ্যে এক জনের মৃত্যু এবং দু’জনের পদত্যাগের পর কার্যত নয় জন কাউন্সিলর অবশিষ্ট ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অনুপস্থিত থাকায় আট জনের উপস্থিতিতেই পুরপ্রধান নির্বাচন হয়। সেই আট জনের সম্মতিতেই চূড়ান্ত হয় বিজয়ের নাম ।
কংগ্রেস কাউন্সিলার বিপ্লব কয়াল বলেন,"ঝালদার মানুষের স্বার্থেই আমরা আজকের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছি। অনবরত পুরপ্রধান বদলে শহরের বাসিন্দারা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন।"
তৃণমূল কাউন্সিলার সোমনাথ কর্মকার জানান, "এলাকার উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে শহরের স্বার্থে ও অচলাবস্থা কাটাতে আজকের সভায় অংশ নিয়েছি।"
ঝালদা পুরসভার এই মেয়াদের ইতিহাস অবশ্য আরও নাটকীয়। ২০২২ সালের পুরভোটের পর থেকেই কাউন্সিলর তপন কান্দুর হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে বার বার সংবাদ শিরোনামে এসেছে এই পুরসভা। প্রথমে পুরপ্রধান হন তৃণমূলের সুরেশ আগরওয়াল। বছর ঘোরার আগেই তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা। দিন কয়েকের জন্য পুরপ্রধানের দায়িত্বে জবা মাছুয়ার। এরপর আদালতের নির্দেশে পুরপ্রধানের কুর্সিতে বসেন শীলা চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু এক দিন পরেই তাঁকে সরিয়ে তৎকালীন তৃণমূল সরকার সুদীপ কর্মকারকে পুরপ্রধান করে। তাঁর মেয়াদও স্থায়ী মাত্র এক দিন। ভারপ্রাপ্ত পুরপ্রধানের দায়িত্ব সামলান তপন কান্দুর স্ত্রী পূর্ণিমা কান্দু। এক মাসও কাটেনি, ফের পুরপ্রধান হন শীলা চট্টোপাধ্যায়—কংগ্রেস এবং তৃণমূলের একাংশের সমর্থনে। সেখানেও স্থায়ী হয়নি সমীকরণ। বছর ঘোরার আগেই ফের অনাস্থা। শেষ পর্যন্ত পুরপ্রধানের কুর্সিতে ফিরে আসেন সুরেশ আগরওয়াল। রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর তাঁর ইস্তফায় ফের তৈরি হয় শূন্যতা। সেই শূন্যতাই বুধবার পূরণ করলেন বিজয় কান্দু।
ঝালদা পুর প্রধান বিজয় কান্দু বলেন,
"ঝালদাবাসীর পরিষেবা ও উন্নয়নই আমার মূল লক্ষ্য। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই অচলাবস্থা কাটিয়ে পুরসভাকে সচল রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।"
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, চার বছরে আট বার পুরপ্রধান বদলের পর এ বার কি সত্যিই স্থায়ী হবে ঝালদা পুরসভার কুর্সি?