অন্যান্য শহর

সিলিকোসিসের থাবা পুরুলিয়ায়! শিল্প দূষণে ১৩ শ্রমিকের মৃত্যু? নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পদূষণের অভিযোগ

উন্নয়ন নাকি মৃত্যুদূত? পুরুলিয়া জেলা জুড়ে নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পদূষণ এবং সিলিকোসিসের মতো মারণব্যাধির থাবায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় এবার রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন স্থানীয় পরিবেশ ও বিজ্ঞান কর্মীরা।
সিলিকোসিসের থাবা পুরুলিয়ায়! শিল্প দূষণে ১৩ শ্রমিকের মৃত্যু? নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পদূষণের অভিযোগ

 


সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া:

উন্নয়ন নাকি মৃত্যুদূত? পুরুলিয়া জেলা জুড়ে নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পদূষণ এবং সিলিকোসিসের মতো মারণব্যাধির থাবায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় এবার রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন স্থানীয় পরিবেশ ও বিজ্ঞান কর্মীরা। আশঙ্কাজনক হারে শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং একাধিক শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যুর প্রতিবাদে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এর দ্বারস্থ হয়েছিল ব্রেকথ্রু সায়েন্স সোসাইটি‌ এবং ‘রঘুনাথপুর মহকুমা দূষণ বিরোধী প্রাণ প্রকৃতি রক্ষা মঞ্চ।

জেলা প্রশাসনকে দেওয়া ওই ডেপুটেশনে প্রতিনিধিদল অভিযোগ তোলেন, নিতুড়িয়া সহ গোটা জেলার পাথর খাদান, ক্র‍্যাশার ও স্পঞ্জ আয়রন কারখানাগুলো পরিবেশবিধির তোয়াক্কা না করে চরম দূষণ ছড়াচ্ছে। সম্প্রতি ওমেগা মিনারেলস প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি কারখানায় কর্মরত  ১২ থেকে ১৩ জন শ্রমিক একই ধরনের শ্বাসকষ্টের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন বলে দাবি সংগঠনগুলির।

প্রশাসনের ওপর ধারাবাহিক চাপের মুখে গত ২১ তারিখে মেডিকেল কলেজে একটি বিশেষ 'সিলিকোসিস বোর্ড' বসানো হয়, যেখানে ২১ জন আক্রান্ত পেশেন্ট অংশ নেন। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও সেই রিপোর্টের ফলাফল কেন জনসমক্ষে আনা হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, আক্রান্তদের সংগঠিত করার কাজে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া অক্ষয় দাস নামে এক শ্রমিক গত ২৩ তারিখ মারা যান, অথচ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পরিবার জানতেও পারেনি তিনি ঠিক কী রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি ধামাচাপা দিতেই মেডিকেল রিপোর্টের সত্যতা গোপন রাখা হচ্ছে।

বিজ্ঞান মঞ্চের পুরুলিয়া জেলা সম্পাদক ও রঘুনাথপুর দূষণ বিরোধী মঞ্চের আহ্বায়ক স্বদেশপ্রিয় মাহাতো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এই সিলিকোসিস রোগে ফুসফুস পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। এর কোনো চিকিৎসা নেই। প্রশাসনকে স্পষ্ট জানাতে হবে ওই ২১ জনের মধ্যে কতজন সিলিকোসিস রোগী। নিতুড়িয়ার একটি কারখানাতেই ডজনখানেক মানুষ মারা যাওয়ার পরও জেলায় এই ধরণের আরও প্রায় ২০টি কোয়ার্টজ ও ক্র‍্যাশার কারখানাকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেগুলো রমরমিয়ে চলছে। অবিলম্বে প্রতিটি স্পঞ্জ আয়রন কারখানার মেডিকেল রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে এবং দূষণ সৃষ্টিকারী কারখানাগুলোর ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা সমস্ত বাসিন্দার শারীরিক পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।"

দূষণ প্রতিরোধ ও প্রকৃতি রক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক রাজেন টুডু বলেন,
"মাটির নিচের খনিজ সম্পদ ও মিনারেল প্রশাসন দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু মাটির ওপরের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকু দেখতে পাচ্ছে না। আজকে সাধারণ মানুষকে বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে রাজপথে নামতে হচ্ছে। আমরা স্পষ্ট দাবি জানাচ্ছি পুরুলিয়ায় নতুন করে কোনো রেড ক্যাটাগরির ক্ষতিকর কারখানা করা যাবে না এবং বিদ্যমান কারখানাগুলোতে অবিলম্বে দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। অন্যথায় পুরো জেলা জুড়ে মানুষ একজোটে বৃহৎ আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।"

একাধিক মৃত্যুর ঘটনায় বর্তমানে রঘুনাথপুর সহ সমগ্র মহকুমায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, উন্নয়নের নামে তাঁদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বিষাক্ত ধোঁয়ার মুখে। মারণ কারখানা নয়, মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য পরিবেশবান্ধব ও শ্রমনিবিড় শিল্প গড়ে তোলার দাবি তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। পরিবেশকর্মীদের আশা, উদ্ভূত এই মানবিক বিপর্যয় বিবেচনা করে জেলা প্রশাসক দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।