চাষাবাদ ব্লক

এল নিনোর চোখরাঙানি, খরা মোকাবিলায় আধুনিক চাষে জোর, হাজির মন্ত্রী

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের রাষ্ট্র মন্ত্রী নদিয়ারচাঁদ বাউরী। ছিলেন উপ-কৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) অভিজিৎ মণ্ডল, সহ-কৃষি অধিকর্তা (তথ্য) মুক্তেশ্বর সর্দার, সহ-কৃষি অধিকর্তা (বিষয়বস্তু) অরুণাংশু দত্ত প্রমুখ।
এল নিনোর চোখরাঙানি, খরা মোকাবিলায় আধুনিক চাষে জোর, হাজির মন্ত্রী

 

নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:

কখনও ঝমঝম করে বৃষ্টি, আবার কখনও টানা কয়েক দিন আকাশ শুকনো। বৃষ্টি এলেও সময়মতো নয়। ফলে জমিতে জল ধরে রাখা থেকে ফসলের ফলন—সব কিছু নিয়েই দুশ্চিন্তায় চাষিরা। তার উপর এ বছর মাথাব্যথার অন্যতম কারণ ‘এল নিনো’। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বিস্তীর্ণ অংশের জল অস্বাভাবিক ভাবে গরম হয়ে উঠছে। সেই প্রভাবেই ভারতের বর্ষার গতিপ্রকৃতি বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়ার এই অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন প্রান্তিক চাষিরা। সেই কথা মাথায় রেখে জল সংরক্ষণ, কম জলে চাষ এবং প্রাকৃতিক কৃষির উপর জোর দিয়ে বিশেষ কর্মসূচি নিল পুরুলিয়া- ২ ব্লক কৃষি দফতর।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের রাষ্ট্র মন্ত্রী নদিয়ারচাঁদ বাউরী। ছিলেন উপ-কৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) অভিজিৎ মণ্ডল, সহ-কৃষি অধিকর্তা (তথ্য) মুক্তেশ্বর সর্দার, সহ-কৃষি অধিকর্তা (বিষয়বস্তু) অরুণাংশু দত্ত, কৃষি রসায়নবিদ (গবেষণা) সমরেশ হাঁসদা, সহকারী উদ্ভিদবিদ (গবেষণা) কৌশিক মুর্মু, পুরুলিয়া- ২ ব্লকের সহ-কৃষি অধিকর্তা ড. সজল পতি, কেভিকে কল্যাণের প্রধান ও বরিষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. মানস ভট্টাচার্য এবং বি.সি.কে.ভি.-র রঘুনাথপুর শাখার সহকারী অধ্যাপক ড. চৈতন সরেন।

কৃষকদের বোঝানো হয়, ‘এল নিনো’ বলতে সহজ কথায় এমন একটি আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতিকে বোঝায়, যার প্রভাবে কোথাও বৃষ্টি কমে যেতে পারে, আবার কোথাও বৃষ্টির ধরন বদলে যেতে পারে। ফলে চাষের সময় ঠিকমতো বৃষ্টি না হলে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে আগেভাগে জল বাঁচিয়ে রাখা এবং কম জলে চাষের পদ্ধতি গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কৃষি বিশেষজ্ঞেরা জানান, চাষের জমিতে জলের অপচয় কমাতে ড্রিপ ও স্প্রিঙ্কলার সেচ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি গাছের গোড়ায় জল পৌঁছয়। পাশাপাশি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে ‘মালচিং’ এবং কম জলে টিকে থাকতে পারে এমন বীজ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।

চাষের খরচ কমানো এবং মাটির উর্বরতা ধরে রাখার জন্য রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ‘প্রাকৃতিক কৃষি’র দিকেও কৃষকদের উৎসাহিত করা হয়। কর্মসূচিতে চাষিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘ন্যাচারাল ফার্মিং কিট’।

কৃষির পাশাপাশি কর্মসূচিতে ছিল সামাজিক বার্তাও। ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ অভিযানের অংশ হিসেবে কৃষকদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি ও পরিবেশকে রক্ষা করাও নাগরিকের দায়িত্ব।

খরার সময়ে শুধু ফসল নয়, গবাদি পশুর দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত পানীয় জল, পুষ্টিকর খাবার এবং ছায়াযুক্ত আশ্রয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়।

পুরুলিয়া-২  ব্লকের সহকারী কৃষি অধিকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচির শেষে কৃষকদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে চাষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কোনও সমস্যা হলে নিকটবর্তী ব্লক কৃষি দফতর বা কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।

কিন্তু এল নিনো আসলে কী?

সহজ কথায়, পৃথিবীর একেবারে অন্য প্রান্তে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রের জল যখন স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক গরম হয়ে যায়, তখন তাকে বলা হয় ‘এল নিনো’। এই গরম সমুদ্রের কারণে বাতাসের চলাচল এবং বৃষ্টির স্বাভাবিক ব্যবস্থা বদলে যেতে পারে। তার প্রভাব পৌঁছতে পারে ভারত পর্যন্ত। সাধারণত এল নিনোর বছরে ভারতের বর্ষায় বৃষ্টির পরিমাণ কমার প্রবণতা দেখা যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে সারা দেশে বৃষ্টি হবেই না। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও আবার অনাবৃষ্টি—বৃষ্টির বণ্টনেও বড়সড় পরিবর্তন হতে পারে।

এল নিনো কেন হয়?

এর কোনও একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই। এটি পৃথিবীর সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক একটি চক্রের অংশ। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় এলাকায় সমুদ্রের জল কখনও অস্বাভাবিক গরম হয়—তখন এল নিনো, আবার কখনও অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়—তখন তাকে বলা হয় ‘লা নিনা’। এর মাঝের স্বাভাবিক অবস্থাকে বলা হয় ‘এনসো নিউট্রাল’।

এ বছরও আচমকা এল নিনো তৈরি হয়নি। ২০২৬-এর শুরুতে প্রশান্ত মহাসাগরে লা নিনার প্রভাব ছিল। পরে তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় যায়। বসন্ত পেরিয়ে গরম জল জমতে শুরু করে এবং এপ্রিল-মে নাগাদ এল নিনোর দিকে দ্রুত মোড় নেয় পরিস্থিতি। মে মাসে ভারতের আবহাওয়া দফতরও জানিয়েছিল, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিক অবস্থা থেকে এল নিনোর দিকে পরিবর্তন হচ্ছে এবং বর্ষার মরসুমে এল নিনো তৈরি হতে পারে।

জুনে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়। মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা NOAA-ও জানায়, এল নিনো তৈরি হয়েছে এবং ২০২৬-এর শেষের দিকে তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এ বার পরিস্থিতি নিয়ে এত আলোচনা কেন?

কারণ এল নিনো শুধু তৈরি হয়েছে বলেই নয়, এটি দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। ১৩ অগস্টের NOAA রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে খুব শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনাও ৯০ শতাংশের বেশি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ভারতের ক্ষেত্রে আশঙ্কার জায়গাটা এখানেই। এল নিনো শক্তিশালী হলে ভারতীয় বর্ষার উপর তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। অবশ্য এল নিনো একাই সব কিছু ঠিক করে দেয় না। ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি, ‘আইওডি’, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, মৌসুমি অক্ষরেখার অবস্থান-সহ আরও অনেক বিষয় বর্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এল নিনো থাকলেই খরা হবেই—এমন কথা বলা ঠিক নয়।

এর আগেও এমন পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে।

সাম্প্রতিক অতীতে ২০১৫ এবং ২০২৩ সাল ছিল উল্লেখযোগ্য এল নিনোর বছর। ২০১৫ সালে এল নিনোর প্রভাবের সঙ্গে ভারতের বর্ষায় বড় ঘাটতি দেখা গিয়েছিল। গোটা দেশে জুন-সেপ্টেম্বরের বৃষ্টি স্বাভাবিকের মাত্র ৮৬ শতাংশে নেমে গিয়েছিল।

২০২৩ সালেও এল নিনো ছিল। সেই বছর গোটা দেশে বর্ষার বৃষ্টি হয়েছিল স্বাভাবিকের ৯৪ শতাংশ। বিশেষ করে আগস্টে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতো—সেই মাসে দেশজুড়ে বৃষ্টি হয়েছিল স্বাভাবিকের মাত্র ৬৪ শতাংশ। তবে পরে ভারত মহাসাগরের ‘পজিটিভ আইওডি’ কিছুটা পরিস্থিতি সামলে দেয়।

আবার ২০১৯ সালের উদাহরণটি দেখায়, এল নিনো থাকলেই যে বর্ষা খারাপ হবেই, তা নয়। সেই বছর দেশে মোট বর্ষার বৃষ্টি হয়েছিল স্বাভাবিকের ১১০ শতাংশ। অর্থাৎ এল নিনোর প্রভাবকে অন্য আবহাওয়াগত পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে দিতে পারে।

তবে এ বার চাষিদের সতর্ক হওয়ার কারণ, বর্ষার বৃষ্টি শুধু কম হওয়া নয়—সময়মতো না হওয়া এবং বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ বিরতি তৈরি হওয়াও কৃষির জন্য বড় বিপদ। একটি ফসলের জন্য প্রয়োজনের সময়ে কয়েক দফা বৃষ্টি না হলে মোট বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকলেও জমিতে তার সুফল পাওয়া যায় না।

এই পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই পুরুলিয়া-২ ব্লক কৃষি দফতর কৃষকদের জল বাঁচিয়ে চাষ এবং কম জলে ফসল ফলানোর কৌশল শেখাতে বিশেষ কর্মসূচি নিল।