শিক্ষা ব্লক

সময়ে আসেন না শিক্ষকরা, পুরুলিয়ায় শিক্ষার বেহাল ছবি

বিদ্যালয়ে মোট ১৩০ জন ছাত্রছাত্রী। রয়েছেন ৬ জন শিক্ষক। তা সত্ত্বেও গত মঙ্গলবারে গিয়ে দেখা গেল বেলা ১১টা পর্যন্ত তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে সবকটি শ্রেণিকক্ষ। বাধ্য হয়ে স্কুলের গেটে এবং আশপাশের রাস্তায় শিক্ষকদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে শিশুরা। ভেঙে পড়ল নিয়মিত প্রার্থনার সময়সূচিও।
সময়ে আসেন না শিক্ষকরা, পুরুলিয়ায় শিক্ষার বেহাল ছবি

 


নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া:

সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দৈন্যদশা এবং শিক্ষকদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ছবি ফের সামনে এল পুরুলিয়ার প্রান্তিক এলাকায়। দিনের পর দিন নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও তালা খোলে না শ্রেণিকক্ষের, মাঠে-রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় খুদে পড়ুয়ারা। পুরুলিয়া মফস্বল থানার অন্তর্গত শিহলি-২ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি দেখা গেল এমনই চরম বিশৃঙ্খলার ছবি।

বিদ্যালয়ে মোট ১৩০ জন ছাত্রছাত্রী।  রয়েছেন ৬ জন শিক্ষক। তা সত্ত্বেও গত মঙ্গলবারে গিয়ে দেখা গেল বেলা ১১টা পর্যন্ত তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে সবকটি শ্রেণিকক্ষ। বাধ্য হয়ে স্কুলের গেটে এবং আশপাশের রাস্তায় শিক্ষকদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে শিশুরা। ভেঙে পড়ল নিয়মিত প্রার্থনার সময়সূচিও।

এ বিষয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রামের অভিভাবক থেকে শুরু করে রন্ধনকর্মীরা। গ্রামের অভিভাবক সুবোধ দাস স্পষ্ট জানান, "শিক্ষকরা সঠিক সময়ে না আসায় বাচ্চাদের পঠনপাঠন পুরোপুরি লাটে উঠেছে। সরকারি স্কুলে এভাবে চলতে থাকলে প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা কোথায় যাবে? এই অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"

একই সুর মিড-ডে মিলের দায়িত্বে থাকা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যা জবারানি মাহাতো-র গলায়। তিনি বলেন, "প্রতিদিনই প্রায় একই দৃশ্য। আমরা নির্দিষ্ট সময়ে রান্না শেষ করতে এলে দেখি বাচ্চারা বাইরে ঘুরছে, কোনো শিক্ষক নেই। সময়মতো স্কুল না খুললে শিশুদের খাবারের সময়সূচিও ভেস্তে যায়।"

শ্রেণিকক্ষের বাইরে অপেক্ষারত পড়ুয়া সাহিনা খাতুন ও সাকিব আনসারী জানায়, "স্যাররা প্রায়দিনই ১১টার আগে স্কুলে আসেন না। তাই আমাদের বাইরেই বসে থাকতে হয় বা মাঠে ঘুরে সময় কাটাতে হয়।"

বেলা ১১টা নাগাদ বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে তড়িঘড়ি তালা খুলতে দেখা যায় প্রধান শিক্ষককে। দেরিতে আসার কারণ জানতে চাওয়া হলে প্রধান শিক্ষক রাজেশ দাস সাফাই দিয়ে বলেন, "আজ শরীরটা ভালো ছিল না। তাছাড়া ট্রেনের টিকিট কাটতেও গিয়েছিলাম, তাই একটু দেরি হয়ে গেল।" বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, "কেউ সেনসাস বা অন্য কাজের দায়িত্বে থাকতে পারেন, তবে বাকিরা কেন আসেননি তা আমার জানা নেই।"

পরবর্তীতে বেলা ১১:১০ নাগাদ প্রধান শিক্ষক ও শিশুদের নিয়েই সম্পন্ন হয় দৈনিক প্রার্থনা। ১১:৩০ নাগাদ উপস্থিত হন আরও এক শিক্ষক ভাগবত মাহাতো। বিলম্বে আসার কারণ হিসেবে তিনিও শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে বলেন, "আজ শরীর খারাপ থাকার কারণেই কিছুটা দেরি হলো। তবে অন্যান্য শিক্ষকরা কেন আসেননি, সে বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না।"
বেলা এগারোটা  পঁয়তাল্লিশ নাগাদ আরও দুইজন শিক্ষক উপস্থিত হলেও বাকিদের দেখা মেলেনি। গ্রামের অবহেলিত পরিবারের সন্তানদের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই যেখানে শিক্ষার একমাত্র ভরসা, সেখানে শিক্ষকদের এমন টানা অনিয়ম ও উদাসীনতা প্রান্তিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।