সুইটি চন্দ্র, পুরুলিয়া ও বাঘমুন্ডি:
একই অঙ্গে কত রূপ! কখনও গণেশ, কখনও কার্তিক। যে শিল্পী আখড়ায় মহিষাসুর, পর মুহূর্তেই আবার মহিষাসুরমর্দিনীর রূপ ধারণ করেন তিনি। কিন্তু মুখোশের আড়ালে যে মানুষটি থাকেন, তাঁর জীবনটা অনেক সময়ই রঙহীন। সেখানে অনাহার আছে, অর্ধাহার আছে, আছে মাটির বাড়ির খাপরার চাল আর দু'বেলা পেটভরে ভাত না জোটার দীর্ঘ ইতিহাস। পুরুলিয়ার সেই কঠিন বাস্তবের মাটিতেই দাঁড়িয়ে ছৌ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ৫৪ বছরের নৃপেন সহিস এবং ২৫ বছরের সোমনাথ মাহাতো। একজন জীবনের সিংহভাগ কাটিয়েছেন অভাবের সঙ্গে লড়াই করে, আরেকজন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন পুরুলিয়ার লোকঐতিহ্যকে। এ বার সেই দুই শিল্পীর হাতেই উঠছে দেশের অন্যতম সেরা সাংস্কৃতিক সম্মান—সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার।
ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীনস্থ এই সংস্থা সম্প্রতি ১০৮ জন পুরস্কারপ্রাপকের নাম ঘোষণা করেছে। ২০২৪ সালের নৃত্য বিভাগে সম্মান পাচ্ছেন পুরুলিয়া ১ নং ব্লকের সোনাইজুড়ি অঞ্চলের বালিগাড়া গ্রামের নৃপেন সহিস। আর ২০২৫ সালের লোকনৃত্য বিভাগে পুরস্কৃত হচ্ছেন বাঘমুণ্ডি ব্লকের সেরেঙডি অঞ্চলের কুশলডির তরুণ সোমনাথ মাহাতো।
পড়াশোনায় মন বসত না নৃপেনের। মাত্র দশ-এগারো বছর বয়সে দাদু রাসু সহিসের হাত ধরে ছৌ নাচের জগতে প্রবেশ। বংশপরম্পরায় চলে আসা ‘রাসু সহিস বালিগাড়া কিষান ছৌ নৃত্য পার্টি’ই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। এক সময় অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কেটেছে। তবু ছৌ ছাড়েননি। আজ বড় ছেলে বুদ্ধেশ্বর এবং ছোট ছেলে বিরোচনের হাতেও সেই শিল্পের উত্তরাধিকার তুলে দিয়েছেন তিনি। বিদেশে গিয়ে নাচ দেখানোর ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে গেলেও, এই শিল্পের টানেই ঘুরে ফেলেছেন ভারতের নানা প্রান্ত।
ছৌ শিল্পীর স্ত্রী সাধনা সহিস বলেন, "আমার স্বামী সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পাচ্ছেন জেনে খুব ভালো লেগেছে। আমরা খুব আনন্দিত। যখন ছেলেমেয়েরা ছোট ছিল, ছৌ নাচের প্রোগ্রাম কম থাকত, তখন আমার স্বামী অন্য কাজ করার জন্য বাজারে যেতেন। তবে এখন ছৌ নাচের প্রোগ্রাম বেড়ে যাওয়ায় নাচের মাধ্যমেই সংসার চালান। যখন নাচের প্রোগ্রাম থাকে না, তখন সংসার সামলাতে বাজারে অন্য কোনো ছোটখাটো কাজ করতে হয়। এই কাজে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। নাচের সিজন না থাকলে স্বামী ও সন্তানরা রঙের কাজ বা বাজারে অন্য কোনো কাজ করে জোড়াতালি দিয়ে সংসার চালাতেন।"
নৃপেন সহিস বলেন, "১২ বছর বয়স থেকে নাচ শিখছি। দাদু রাসু সহিসের কাছ থেকে নাচ শিখেছি। মাদ্রাজ, হিমাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, দিল্লি, বোম্বাই, গুজরাট এবং কাশ্মীরসহ বিভিন্ন জায়গায় আমি নাচ পরিবেশন করেছি। এখন কৃষ্ণ আর শনিদেবের ভূমিকায় অভিনয় করছি। একটা সময় সংসারে প্রচণ্ড অভাব ছিল। কখনও কখনও রাতে না খেয়েও ঘুমাতে হয়েছে। তবে বর্তমানে সেই অভাব কিছুটা দূর হয়েছে।"
অন্যদিকে, বয়সে অনেক ছোট হলেও অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ সোমনাথের। দেশের মঞ্চ পেরিয়ে জাপান ও মালয়েশিয়াতেও পৌঁছে গিয়েছে তাঁর ছৌ। বাবা সাধুচরণের কাছেই হাতেখড়ি। সাধুচরণ নিজেও সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী। বাবা- ছেলে—দু'জনেই এই সম্মানে ভূষিত, এমন নজির দেশে বিরল প্রায়। ওস্তাদ আল্লা রাখা - ওস্তাদ জাকির হোসেন, ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ- ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ- দের তালিকায় উঠে এলেন ভারতের সর্বোচ্চ পারফর্মিং আর্ট সম্মান প্রাপক পুরুলিয়ার পিতা পুত্র।
ভূগোলে অনার্স, ছৌ নৃত্যে ডিপ্লোমাধারী সোমনাথ ছোট্ট গোলদারি দোকান চালানো ছৌ শিল্পী বাবার স্বপ্নকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান। তাঁর কাছে ছৌ শুধু লোকনৃত্য নয়, পুরুলিয়ার পরিচয়, মাটির গন্ধ, মানুষের জীবনসংগ্রামের দলিল।
সোমনাথ জানান, এই সাফল্য একদিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে অনেক দুঃখ, কষ্ট, দীর্ঘ পরিশ্রম, হতাশা এবং লাগাতার চেষ্টা। ছোটবেলা থেকেই ছৌ নাচের সাথে যুক্ত আছেন। দেশের বাইরে এবং বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে।
সঙ্গীত নাটক আকাদেমির একটি প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার পর, সেখানকার একজন ম্যাম তাঁকে ২৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য 'উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান যুব পুরস্কার'-এর ফর্ম ফিলাপ করতে বলেন এবং সেই অনুযায়ী তিনি আবেদন করেছিলেন।তিনি বলেন, ছৌ শিল্পী মানেই প্রতিটি পরিবারে কম-বেশি অভাব থাকে। তবে যারা ছৌ নাচকে সত্যি ভালোবাসেন, তারা টাকা-পয়সার কথা ভাবেন না। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে কীভাবে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যায়।
সোমনাথের বাবা সাধুচরণ মাহাতো বলেন, আমি নিজেই সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত ছৌ শিল্পী। ছেলের পুরস্কার প্রাপ্তিতে বাবা হিসেবে অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্বিত। অত্যন্ত অভাবের মধ্য দিয়ে আমার ছেলে ছোট থেকে পড়াশোনা করেছে। শত অভাব থাকা সত্ত্বেও সে পড়াশোনায় ভালো ফলাফল করেছে কখনো পড়াশোনাকে অবহেলা করেনি।পড়াশোনার পাশাপাশি সে ছৌ নাচকে অত্যন্ত ভালোবাসে। এর প্রতি ওর গভীর আগ্রহ রয়েছে। ছেলে তার কঠোর পরিশ্রমের সঠিক ফল পেয়েছে। "
মুখোশ পরে মঞ্চে ওঠার মুহূর্তে শিল্পীরা নিজেদের ভুলে যান। ভুলে যান অভাব, অপমান, সংসারের টানাপোড়েন। আর এ বার দেশের সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক মঞ্চ যেন সেই মুখোশের আড়ালের মানুষগুলোকেই কুর্নিশ জানাল। পুরুলিয়ার লালমাটির পথ পেরিয়ে তাঁদের সাফল্যের এই যাত্রা প্রমাণ করল, লোকশিল্পের শক্তি এখনও দেশের সাংস্কৃতিক আত্মাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।