নিজস্ব প্রতিনিধি , জয়পুর :
আধার তো রয়েছেই। এ বার পড়ুয়াদের জন্য তৈরি হচ্ছে আরও একটি বিশেষ পরিচয়—‘আপার আইডি’। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর ভাবনা অনুযায়ী ‘এক দেশ, এক ছাত্র পরিচিতি’ চালুর লক্ষ্যেই দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে অটোমেটেড পার্মানেন্ট অ্যাকাডেমিক অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রি বা APAAR ID তৈরির কাজ।
পুরুলিয়াতেও শুরু হয়ে গিয়েছে সেই প্রস্তুতি। ব্লক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে চলছে প্রশিক্ষণ। বুধবার জয়পুরের আর বি বি হাইস্কুলে আপার আইডি নিয়ে প্রশিক্ষণ নেন জয়পুর ব্লকের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক সুরেশ চন্দ্র কুমার, নোডাল শিক্ষক সম্পদ মাজি, ভাস্কর চৌধুরী, এসআই অফিসের নোডাল কর্মী বিকাশ চন্দ্র মাহাতো-সহ শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকেরা।
কী এই ‘আপার আইডি’?
APAAR-এর পুরো নাম Automated Permanent Academic Account Registry। এটি পড়ুয়ার জন্য তৈরি একটি স্থায়ী, ১২ সংখ্যার অনন্য শিক্ষাগত পরিচয়পত্র। আধারের মতো নাগরিক পরিচয় নয়, বরং পড়ুয়ার গোটা শিক্ষাজীবনের ‘ডিজিটাল খাতা’ হিসেবেই কাজ করবে এই পরিচয়। স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা—পড়াশোনার বিভিন্ন পর্যায়ে অর্জিত নম্বর, মার্কশিট, সার্টিফিকেট, ডিগ্রি, ডিপ্লোমা, শিক্ষাগত ক্রেডিট, এমনকি বিভিন্ন সহ-পাঠক্রমিক সাফল্যের তথ্যও এর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, স্কুল বদলালেও বা উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানে গেলেও পড়ুয়ার শিক্ষাগত পরিচয়টি সঙ্গে থাকবে। সরকারি ব্যবস্থায় এটিকে কার্যত পড়ুয়ার ‘লাইফলং অ্যাকাডেমিক পাসপোর্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লাভ কোথায়?
এত দিন কোনও পড়ুয়াকে স্কুল বা কলেজ বদলাতে হলে একাধিক নথি, মার্কশিট বা শংসাপত্র সামলাতে হত। আপার আইডির মাধ্যমে সেই শিক্ষাগত নথিগুলিকে একটি ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আপার আইডি DigiLocker-এর সঙ্গে যুক্ত থাকায় পড়ুয়ার শিক্ষাগত নথি ডিজিটাল ভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
ফলে স্কুল পরিবর্তন, উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, পরীক্ষায় আবেদন, বৃত্তি, শিক্ষাগত ক্রেডিট স্থানান্তর, এমনকি ভবিষ্যতে চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রেও নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে ভুয়ো নথি বা একই পড়ুয়ার একাধিক রেকর্ডের সমস্যা কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে এই ব্যবস্থায়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জাতীয় শিক্ষানীতির অন্যতম লক্ষ্য হল পড়াশোনার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীর চলাচলকে সহজ করা। সেই ব্যবস্থায় APAAR-এর গুরুত্ব যথেষ্ট। একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মাধ্যমে কোনও পড়ুয়ার শিক্ষাগত অগ্রগতি দীর্ঘ সময় ধরে নথিভুক্ত রাখা যাবে। ফলে পড়ুয়া কোথায় পড়েছে, কী কী যোগ্যতা অর্জন করেছে, কতগুলি শিক্ষাগত ক্রেডিট পেয়েছে—তার একটি ধারাবাহিক ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে।
কী ভাবে তৈরি হবে?
আপার আইডি তৈরির ক্ষেত্রে স্কুলই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পড়ুয়ার তথ্য যাচাই, UDISE+ ব্যবস্থায় তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর আইডি তৈরি হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পড়ুয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিও প্রয়োজন। আপার আইডি তৈরি হলে তা পড়ুয়ার DigiLocker অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়।
তবে এই প্রক্রিয়ায় পড়ুয়ার নাম, জন্মতারিখ-সহ পরিচয়গত তথ্যের মিল থাকা জরুরি। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী UDISE+–এ থাকা পড়ুয়ার নামের সঙ্গে আধারের তথ্যের মিল এবং PEN পার্মানেন্ট এডুকেশন নম্বর থাকা APAAR তৈরির অন্যতম পূর্বশর্ত। তথ্যের অমিল থাকলে আইডি তৈরির প্রক্রিয়ায় সমস্যা হতে পারে।
ফলে ‘আধার নয়, আপার’—বিষয়টি আসলে নতুন কোনও নাগরিক পরিচয়পত্র তৈরির চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষাগত পরিচয়ের ডিজিটাল কাঠামো। পুরুলিয়ার স্কুলগুলিতে সেই ব্যবস্থার হাতেখড়ির প্রশিক্ষণ শুরু হওয়ায় আগামী দিনে জেলার পড়ুয়াদের শিক্ষাজীবনের নথিও ক্রমশ ঢুকে পড়বে এক ছাতার তলায়।