সুজয় দত্ত , পুরুলিয়া:
৩২ বছরের চাকরি জীবন। হাতে কখনও পুলিশের লাঠি , কখনও তদন্তের খাতা। কখনও আবার দুষ্কৃতীর পিছনে ছুটে চলা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে। অপরাধী ধরেছেন, জটিল তদন্তের কিনারা করেছেন, আবার পথভ্রষ্টদের সমাজের মূল স্রোতে ফেরানোর চেষ্টাও করেছেন। সেই কাজের স্বীকৃতি হিসাবে ২০২৩ সালে পেয়েছেন ‘মেডেল ফর মেরিটোরিয়াস সার্ভিস’। কিন্তু পুলিশের পোশাকের আড়ালে যে মানুষটি আজও নিজেকে শিক্ষক বলেই ভাবেন, শিক্ষক দিবসে সামনে এল তাঁর সেই অন্য পরিচয়।
পুরুলিয়া জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর জয়ন্ত কুমার চক্রবর্তী। ২০২৩ সালের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে তাঁর হাতে উঠেছিল ‘মেডেল ফর মেরিটোরিয়াস সার্ভিস’। তবে পুলিশের চাকরির পরিচয়ের বাইরেও জয়ন্তর জীবনে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষকতার স্মৃতি। শিক্ষক দিবসে নিজের সেই পুরনো পরিচয়ই যেন নতুন করে ফিরে পেলেন তিনি। পুরুলিয়া জেলা পুলিশের উদ্যোগে বেলগুমা পুলিশ লাইনে আয়োজিত একটি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং ক্লাসে প্রশিক্ষক হিসাবে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন জয়ন্ত। পুলিশের সহকর্মীদেরই পাঠ দিতে গিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন পেশাগত জীবনের শুরুর দিনগুলিতে।
সমাজমাধ্যমে পোস্টে জয়ন্ত লিখেছেন, "৩২ বছরের চাকরি জীবন। অপরাধী ধরা আর মানুষকে সিভিক সেন্স শেখানোই আমাদের কাজ। তবুও কেউ কখনো কাছে এসে বলে না, "হ্যাপি টিচার্স ডে, স্যার"। জনগণ আমাদের ভক্তি করে, তবে সে ভক্তি ভয় মিশ্রিত — আইনের ভয়।
তবুও আমি একজন শিক্ষক।
আমার পেশাগত জীবনের শুরুটাই হয়েছিল একজন শিক্ষক হিসেবে। আবছা স্মৃতির পাতায় মাঝে মাঝেই সেই দিনগুলো ভেসে ওঠে। সবাই যে আজ অনেক উঁচু জায়গায় পৌঁছে গেছে, তা বলব না, কিন্তু সেদিন যে শিক্ষার বীজ তাদের মনে গেঁথে দিতে পেরেছিলাম, আজও তার ফল হাতেনাতে দেখতে পাই। আর সেজন্য আজও ভেতর থেকে গর্ব অনুভব করি।
আমি আজও শিক্ষক। আজও আমার সেই পুরোনো ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে অফুরান শুভেচ্ছা পাই।
তবে আজকের দিনে এক পরম প্রাপ্তি ঘটল এই ডিপার্টমেন্ট থেকেই। এই মহান শিক্ষকের জন্মজয়ন্তীতে, পুরুলিয়া জেলা পুলিশের বদান্যতায়, বেলগুমা পুলিশ লাইনে একটি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং ক্লাসে নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে মেলে ধরতে পেরে মনটা গর্বে ভরে উঠল।
এটাই হয়তো আমার জীবনের সেরা শিক্ষক দিবসের উপহার।"
অপরাধীর পিছনে ছুটতে ছুটতে যে পুলিশকর্মী পেয়েছেন মেধাবী পরিষেবার স্বীকৃতি, সেই মানুষটিই আবার শিক্ষক দিবসে ফিরে পেলেন জীবনের প্রথম পেশার স্বাদ। পুলিশের পোশাকের ভিতরে শিক্ষকটা যে এখনও বেঁচে আছেন, জয়ন্তই তার উজ্জ্বল প্রমাণ।