
দেবীলাল মাহাতো:
তামাক পাতার গুঁড়ো ভরে দেওয়া হচ্ছে কেন্দু পাতা দিয়ে তৈরি করা ফাঁপা অংশে। বেঁধে দেওয়া হচ্ছে সুতো। এভাবেই তৈরি হচ্ছে বিড়ি। গ্রাম বাংলার সুখটানের বৃহত্তম মাধ্যম।
আর এই বিড়ি নির্মাণের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে গ্রামের ৯০ শতাংশ মানুষের জীবিকা। বিড়ি বাঁধাই তাদের বেঁচে থাকার রসদ। আড়শা ব্লকের কুদাগাড়া গ্রাম। লোকমুখে গ্রামটি 'বিড়ির গ্রাম' নামেই পরিচিত।

আড়শা বাজার থেকে পূর্বে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রাম। প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম হিসাবে পরিচিত। জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় ৪০০ বছর আগে ঘন জঙ্গলের মাঝে গড়ে উঠেছিল আজকের কুদাগাড়া। এখনও গ্রামের দক্ষিণপ্রান্তে কিছুটা জঙ্গলের দেখা মেলে। তখন গ্রামে সর্দার সম্প্রদায়ের বাসই ছিল বেশি। তুলনায় কুমার সম্প্রদায়ের সংখ্যা ছিল কম। গ্রামবাসীদের কথায়, কোনও একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ বাধে। সেই বিরোধ চরমে ওঠে। অশান্তি বাড়তে থাকায় পাশের গ্রাম মিশিরডি থেকে কুমার সম্প্রদায়ের বেশ কিছু পরিবারকে কুদাগাড়ায় নিয়ে আসা হয়। তার পরেই মেটে সেই বিবাদ। সেই থেকেই দুই সম্প্রদায়ের সহাবস্থানে আজকের কুদাগাড়া। তবে গ্রামের একাংশ জানান, নুনারাম নামে কুমার সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিই গ্রামের আদি বাসিন্দা। বর্তমানে কুম্ভকার বা কুমার সম্প্রদায়ের আধিক্য থাকলেও ব্রাহ্মণ, কর্মকার, মুসলিম, গড়াৎ, সর্দার-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস গ্রামে।

'কুদাগাড়া 'নামের নেপথ্যেও রয়েছে এক ইতিহাস। গ্রামবাসীরা জানান, কুদাগাড়া নামটি মূলত দু’টি শব্দের সমন্বয়— কুঁন্দ এবং গাড়া।' কুঁন্দ' হল খাটের পায়া এবং রুটি বানানোর বেলনা তৈরির জন্য ব্যবহৃত কাঠের একটি বিশেষ যন্ত্র, আর গাড়া মানে পুঁতে দেওয়া। কুঁন্দ পুঁতে এই গ্রামের মানুষ একসময় কাঠের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করতেন। আর সেই কুঁন্দ পোঁতা থেকেই গ্রামের নামকরণ হয়েছে 'কুদাগাড়া'। আবার গ্রামের একাংশের মতে , গ্রাম গড়ে উঠার সময়ে গ্রামে তেমন কৃষিকাজ হতো না। বিভিন্ন জীবজন্তু শিকার করার পাশাপাশি কদ, মাড়োয়া, গুন্দলি, সাঁওয়া প্রভৃতি দেশজ ঘাসের বীজ খেয়ে জীবনযাপন করতেন গ্রামবাসীরা। পরবর্তীকালে গ্রামের গোড়া বা ডাঙা জমিতে ব্যাপক আকারে 'কদ'চাষ শুরু হয়।' গোড়া' জমিতে বিপুল পরিমাণে 'কদ' চাষ হওয়ার কারণেই গ্রামের নামকরণ হয় কুদাগাড়া। গ্রামের অনেক বয়স্ক মানুষের কাছেই 'কদ' চাষের স্মৃতি টাটকা। গ্রামবাসীরা জানান, কয়েক দশক আগেও গ্রামের সিংহভাগ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ছিল কাঠের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা। অযোধ্যা পাহাড় থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তাঁরা খাটের পায়া, বেলনা-সহ নানা জিনিস বানাতেন। সেগুলো হাটে, বাজারে বিক্রি করতেন। আবার পাইকারের হাত ধরে রাঁচি, টাটা,ধানবাদেও চলে যেতো। তবে সরকার কাঠ কাটার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় কয়েক দশক আগে থেকেই সেই কুটিরশিল্প সংকটের মুখে পড়ে। তার জায়গা নেয় বিড়ি শিল্প। এখনও অবশ্য বেশ কয়েকটি পরিবার ধুঁকতে থাকা সেই পুরনো কাষ্ঠশিল্পকে আঁকড়ে ধরে টিকিয়ে রেখেছেন। তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এখন গ্রামের সিংহভাগ মানুষের আয়ের প্রধান উৎসই বিড়ি বাঁধা। সকাল হলেই গ্রামের ছবিটা বদলে যায়। উঠোনে, বারান্দায়, ঘরের ভিতর— বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয়ে যায় বিড়ি বাঁধার কাজ। কারও হাতে তামাক পাতা, কারও হাতে সুতো। পুরুষ, মহিলা, বৃদ্ধ— সকলেই ব্যস্ত। গ্রামবাসীরা জানান, রুজি-রোজগার থেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বিবাহ— সবকিছুই নির্ভর করে এই বিড়ি বাঁধার উপর। এমনকি, মেয়ে কতটা বিড়ি বাঁধতে পারে, তার উপর নির্ভর করে সামাজিক সম্বন্ধও।তবে সমাজে সেই ভাবনা এখন নেই। কারিগর, ক্রেতা, বিক্রেতা মিলিয়ে প্রায় সাতশো পরিবারের অন্ন জোগায় এই শিল্প। কিন্তু এই ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পকে ঘিরেই এখন কালো আশঙ্কার মেঘ। বিশ্বজুড়ে তামাক-বিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়েছে। সরকারও তামাকজাত দ্রব্যের উপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করছে। ফলে চিন্তায় গ্রামবাসীরা। বিড়ি শিল্পে মন্দা এলে সংসার চলবে কী ভাবে, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কুদাগাড়ার আনাচে কানাচে।

কাঠের সামগ্রী তৈরি কিংবা বিড়ি বাঁধার কাজে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ যুক্ত থাকলেও, কুমার সম্প্রদায়ের মানুষের প্রধান জীবিকা মৃৎশিল্প। সেই আদিকাল থেকে কুমার সম্প্রদায়ের মানুষ মৃৎশিল্পের কাজে যুক্ত। গ্রামের ঘরে ঘরে তৈরি হত মাটির হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ থেকে নানা সামগ্রী। মাটির ঘরের ছাউনির জন্য তৈরি হত হাত দিয়ে তৈরি খাপরা, খোলা। গরুর গাড়িতে করে মৃৎশিল্পীরা হাটে বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যাচ্ছেন এটাই ছিল গ্রামের চেনা ছবি । দীপাবলির সময় যা অন্য মাত্রা পেতো । মৃৎশিল্পের কারিগররা জানান, বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার পাকা বাড়ি তৈরির জন্য টাকা দেওয়ায় বেশিরভাগ মানুষই পাকা বাড়ি তৈরি করছেন। তাই কদর কমেছে মাটির টালি, খাপরা ও অন্য সামগ্রীর। তাছাড়া বাজার ছেয়ে গিয়েছে অ্যাসবেস্টস, টিনের ছাউনিতে। এসেছে অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিকের নানা জিনিসপত্র। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ভাটা পড়েছে মৃৎশিল্পে। মাটির কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন গ্রামের বাসিন্দারা। ঐতিহ্যের সেই শিল্প আজ প্রায় অবলুপ্তির পথে। তবে করমচাঁদ কুমারের মতো অনেক মৃৎশিল্পী আজও আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তাঁদের শিকড়কে।

বিড়ি বাঁধার পাশাপাশি সংস্কৃতিরও একটা আলাদা পরিচয় ছিল কুদাগাড়ার। গ্রামের বাসিন্দা তথা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক মহেশ্বর মাঝি বলেন, “অতীতে গ্রামে অনেক সঙ্গীতানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নুনা ওস্তাদ। তাঁর গানের গলা আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে।” তিনি আরও জানান, একসময় গ্রামে নাচনি ও ঝুমুর-রসিকেরও অভাব ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই বসত ঝুমুরের আসর। যাত্রারও চর্চা ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই ঐতিহ্য কিছুটা ম্লান হলেও উৎসবের আমেজে ভাটা পড়েনি। ফি বছর ধুমধামের সঙ্গে গ্রামে দুর্গাপুজো হয়ে থাকে। চার দিন গ্রামজুড়ে থাকে উৎসবের আবহ। গ্রামে রয়েছে দু’টি কালীমন্দির, একটি শিবমন্দির ও একটি হনুমান মন্দির। এই মন্দিরগুলিকে ঘিরেই আবর্তিত হয় গ্রামবাসীদের নিত্যদিনের ধর্মীয় জীবন। গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে গ্রাম্য দেবতা 'জাহিড় বুড়ি' । পাশাপাশি রয়েছে' কুদরা থান '।আগে গ্রামে শিক্ষার হার কম থাকলেও , বর্তমানে সংখ্যাটা বেড়েছে বলে জানান গ্রামের বাসিন্দা শিবরাম মাঝি, চন্দ্রমোহন মাঝিরা । গ্রামে রয়েছে দুটি প্রাথমিক স্কুল। একটি এমএসকে স্কুল। পাশাপাশি এই স্কুল চত্বরে চলে কারিগরি শিক্ষার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও।
তবে গ্রামের বেশকিছু সমস্যাও রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম পানীয় জল । গ্রামেই গড়ে উঠেছে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের নলবাহিত জল প্রকল্প। প্রকল্প থাকলেও, গ্রামবাসীরা সকলে জল পান না। এই নিয়ে গ্রামবাসীদের বিস্তর ক্ষোভ রয়েছে। দাবি রয়েছে পথবাতির। এছাড়া গ্রামে ঢালাই রাস্তা থাকলেও , এখনও বেশকিছু অংশের কাজ বাকি রয়ে গেছে। তার জেরে বর্ষাকালে সমস্যায় পড়তে হয় । দীর্ঘদিন ধরে গ্রামে থাকা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি বেহাল। দ্রুত সংস্কারের আবেদন জানান গ্রামবাসীরা। আর এই ভাবেই ইতিহাসকে আঁকড়ে ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে চলছে কুদাগাড়া।
▪️▪️▪️

মহেশ্বর মাঝি
গ্রামের বাসিন্দা
আমার গ্রাম কুদাগাড়া কেবল একটি গ্রামের নাম নয়। এটি মানভূমের মাটি, মানুষের পরিশ্রম, সংস্কৃতি ও স্মৃতির এক জীবন্ত ইতিহাস।
ছোটনাগপুর মালভূমির লাল মাটির বুক চিরে গড়ে ওঠা এই গ্রাম বহু প্রজন্মের হাসি-কান্না, সংগ্রাম ও স্বপ্নের সাক্ষী। একসময় কুদাগাড়া ছিল শাল, পলাশ, মহুয়া ও কুসুম গাছে ঘেরা এক শান্ত গ্রাম। তখন কাঁচা রাস্তা, মাটির বাড়ি, গরুর গাড়ি আর ধানের গোলাই ছিল গ্রামের পরিচয়। গ্রামেই তৈরি হতো মাটি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী। আর সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের উঠোনে বসত ঝুমুর গানের আসর। বিদ্যুৎ, পাকা রাস্তা বা আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সীমিত, কিন্তু মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল গ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি।সময় বদলালেও লাল মাটির গন্ধ, পলাশের রঙ, ছৌ, ঝুমুরের সুর আর মানুষের আন্তরিকতা মিলে কুদাগাড়া আজও মানভূমের আত্মাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অতীতের ঐতিহ্যকে বুকে নিয়ে বর্তমানের পথে এগিয়ে চলা এই গ্রাম নিঃসন্দেহে পুরুলিয়ার এক গর্বের নাম।
▪️▪️▪️

রমেশ চন্দ্র মাঝি
গ্রামের বাসিন্দা
আমার জন্ম এই গ্রামেই। একসময় গ্রামের মানুষ কাঠের সামগ্রী ও মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছোটনাগপুরের লাল মাটির এই গ্রামে কাঠ ও মাটির গন্ধেই মিশে ছিল জীবিকা। তবে এখন সময় বদলেছে, এখন গ্রামের প্রায় সকলেই বিড়ি বাঁধার কাজের সঙ্গে যুক্ত। আমি ছোটবেলায় দেখেছি, গ্রামের ঘরে ঘরে তৈরি হত মাটির হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ থেকে কত কী! মাটির ঘরের ছাউনির জন্য হাতে তৈরি হত খাপরা, খোলা। গরুর গাড়ি বোঝাই করে মৃৎশিল্পীরা হাটে-বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে যাচ্ছেন — এটাই ছিল আমার গ্রামের চেনা ছবি।
আর দীপাবলির সময় তো কথাই নেই। প্রদীপের চাহিদায় গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় আলোয়-ব্যস্ততায় ভরে উঠত চারদিক। তবে বিভিন্ন কারণে সেই শিল্প আজ সংকটের মুখে। পাকা বাড়ির দাপটে, টিন-অ্যাসবেস্টস আর প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির সামগ্রী। তার মধ্যেও আশার কথা, প্রতিকূলতার মধ্যেও শিকড়ের টানে অনেকেই আজও ধরে রেখেছেন তাঁদের শিকড়কে। বাঁচিয়ে রেখেছেন কুদাগাড়ার মাটির গন্ধ, মানভূমের আত্মাকে। আর এখানেই আমার গ্রাম অন্য সব গ্রামের থেকে আলাদা।
▪️▪️▪️