অন্যান্য ব্লক

কারখানার দূষণে মারণ সিলিকোসিস কাড়লো ১৯ প্রাণ, আন্দোলনে উত্তাল রঘুনাথপুর

একের পর এক রেড ক্যাটাগরি কারখানার কারণে মারণ রোগ সিলিকোসিসের থাবা আরও মারাত্মক ও ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। জঙ্গলমহলে এই মারণ ব্যাধিতে মৃতের সংখ্যা ১৩ থেকে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯।
কারখানার দূষণে মারণ সিলিকোসিস কাড়লো ১৯ প্রাণ, আন্দোলনে উত্তাল রঘুনাথপুর

 


নিজস্ব প্রতিনিধি, রঘুনাথপুর:

একের পর এক রেড ক্যাটাগরি কারখানার কারণে মারণ রোগ সিলিকোসিসের থাবা আরও মারাত্মক ও ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। জঙ্গলমহলে এই মারণ ব্যাধিতে মৃতের সংখ্যা ১৩ থেকে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯। কারখানায় সুরক্ষাবিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক শ্রমিকের মৃত্যুতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মৃতের পরিবারবর্গ ও স্থানীয়রা। নিজেদের স্বজনদের হারিয়ে এবার সোমবার সরাসরি কারখানার গেটে ও প্রশাসনের দরবারে বিক্ষোভে শামিল হয়েছে পরিবারগুলি। এদিন শ্রমিক কল্যাণ সংগঠন এর নেতৃত্বে নিতুড়িয়ার গোপালগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত বিতর্কিত ওমেগা কারখানার সামনে এক বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজিত হয়। প্রতিবাদে অংশ নেওয়া স্বজনহারা পরিবারগুলির আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

"ছেলে মাত্র ২-৩ বছর কাজ করছিল। কাজ করতে করতেই হঠাৎ জ্বর এলো, তার পর ধরা পড়ল সিলিকোসিস আর টিবি। অসুস্থ হয়ে মারা গেল ছেলেটা। কারখানার মালিক না দিল চিকিৎসার টাকা, না করল কোনো বন্দোবস্ত।" আক্ষেপ এক মৃত শ্রমিকের মায়ের।

সিলিকোসিস আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করা এক শ্রমিকের স্ত্রী মালা বাউরি বলেন, "বুকের ভেতর যন্ত্রণা নিয়ে আমার স্বামী ছটফট করতে করতে মারা গিয়েছে। এই কারখানাতেই কাজ করতো। আমরা কোন ক্ষতিপূরণ পাইনি। কারখানার মালিক কে? তাকে আমরা কোনদিন চোখেও দেখিনি।"

সিলিকোসিসের কারণে মৃত আরেক শ্রমিকের স্ত্রী বলেন, "এরপর আমাদের কী হবে কিছুই বুঝতে পারছি না। কারখানা কর্তৃপক্ষ একটা কথাও বলছে না। সেই কারণেই আমরা বাধ্য হই বিক্ষোভ দেখাতে। কিন্তু কারখানার  মালিককে পাওয়া যায়নি।"

প্রান্তিক অধিকার মঞ্চজেলা সম্পাদক  রাজেন টুডু বলেন, "২০১১ সাল থেকে চলা 'ওমেগা মিনারেলস' কারখানার সিলিকা ডাস্ট ফুসফুসে জমে সিলিকোসিসে ৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও প্রশাসন বা স্বাস্থ্য দপ্তর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি এবং চিহ্নিত ১৬ জনের নামও প্রকাশ করেনি। শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য সঠিক ৯ মিলিমিটার মাস্কের পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ কাপড়ের রুমাল, যার ফলে এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলেও কোম্পানি কোনো ক্ষতিপূরণ  দেয় না। সামান্য উপার্জনের খাতিরে এলাকার মানুষ বাধ্য হয়ে এই প্রাণঘাতী কাজ করছেন। তাই  এই ক্ষতিকারক কারখানা বন্ধ করা হোক"।

ইসিএল ঠিকাদার শ্রমিক অধিকার ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক সুদীপ্তা পাল বলেন, "এটি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে চলছে।  কারখানাটি সিলিকোসিস প্রতিরোধে ২০২৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের সুরক্ষাবিধি মানছে না। র‍্যামিং মাস কারখানাগুলো কোনো নিয়ম না মানায় এসব কারখানার বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ ও সব র‍্যামিং মাস কারখানা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানানো হচ্ছে। একই সাথে ওমেগা কারখানার মালিককে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া, মৃত শ্রমিকদের সিলিকোসিস চিহ্নিত করে পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ করা হোক, এই দাবিতে আন্দোলন।"

এদিকে জেলার সার্বিক শিল্পদূষণ ও সিলিকোসিস নিয়ে উদ্বেগজনক রিপোর্ট পেশ করেছে বিজ্ঞানমনস্ক সংগঠন ব্রেক থ্রু সায়েন্স সোসাইটি। সংস্থাটি গত ১৯ এবং ২৭ আগস্ট পুরুলিয়ার জেলাশাসকের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিয়েছে। জেলার ২০টি ক্ষতিকারক কারখানাকে চিহ্নিত করে জমা দেওয়া এই রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে রঘুনাথপুর মহকুমার নিতুড়িয়া থানার গোপালগঞ্জসহ শিল্পতালুকের কোয়ার্টজ কারখানা, পাথর খাদান, ক্রাশার, সিমেন্ট ও স্পঞ্জ আয়রন কারখানা থেকেই সিলিকোসিসের লক্ষণ ছড়িয়ে পড়ছে।
জেলাশাসকের আওতাধীন দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে গত ২১ আগস্ট সিলিকোসিস ডিটেকশন বোর্ড বসলে সেখানে ২১ জন রোগী অংশ নেন।

পুরুলিয়া শহর, রঘুনাথপুর, নিতুড়িয়া, সাঁতুড়ি, সাঁওতালডিহি, পাড়া থেকে শুরু করে বরাবাজার ও বলরামপুর এলাকা জুড়ে ২০০টিরও বেশি রেড ক্যাটাগরি কারখানা চালু রয়েছে। 'ব্রেক থ্রু সায়েন্স সোসাইটি' দাবি জানিয়েছে, নতুন করে কোনো স্পঞ্জ আয়রন, কোয়ার্টজ বা পাথর ক্র্যাশারের অনুমতি দেওয়া যাবে না।

রঘুনাথপুরের দুরমুটে গ্রিনফিল্ড সমন্বিত ইস্পাত কারখানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ঘিরেও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদে রঘুনাথপুর মহকুমা দূষণ বিরোধী ও প্রাণ প্রকৃতি রক্ষা মঞ্চ ইতিমধ্যে দুরমুটে বিশাল দূষণ বিরোধী নাগরিক মহাসভা আয়োজন করে। দূষণের ফলে একের পর এক তরতাজা প্রাণ ঝরে পড়ায় এবং সিলিকোসিসে মৃতের সংখ্যা ১৩ থেকে বেড়ে ১৯ হওয়ায় সমগ্র জঙ্গলমহলে আন্দোলন আরও তীব্র ও বিস্ফোরক রূপ নিতে চলেছে।