সুজয় দত্ত, পুরুলিয়া :
পুরুলিয়াকে ‘জঙ্গলমহলের মডেল জেলা’ হিসাবে গড়ে তুলতে একগুচ্ছ বড় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি। ছররা বিমানবন্দর, ইন্টিগ্রেটেড ট্যুরিজম সার্কিট, কোটশিলা-ঝালদা কনজ়ারভেশন রিজ়ার্ভ, বান্দোয়ানের কুইলাপালে ফিল্ম সিটি থেকে আধুনিক আন্তঃরাজ্য বাস টার্মিনাল—এমন একাধিক প্রকল্পের কথা তুলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিলেন পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। সোমবারের ওই চিঠিতে প্রকল্পগুলির ‘সময়োচিত’ বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত নজরদারির জন্য মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও চেয়েছেন তিনি।
রাজ্য বাজেটে পুরুলিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েই চিঠির শুরু করেছেন সাংসদ। তাঁর বক্তব্য, রাজ্য ও কেন্দ্রের সমন্বয়ে পুরুলিয়ার পর্যটন, যোগাযোগ, বন্যপ্রাণ, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে জঙ্গলমহলের এই জেলা পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
ছররা বিমানবন্দর
জ্যোতির্ময়ের চিঠিতে প্রথমেই রয়েছে ছররা বিমানবন্দর। বিমানবন্দরটির উন্নয়নে প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে তিনি দ্রুত প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া শেষ করার আর্জি জানিয়েছেন। অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক, এয়ারপোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া-সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে বিমানবন্দরটি দ্রুত চালুর দাবি তাঁর। সাংসদের মতে, বিমান যোগাযোগ চালু হলে পর্যটন ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের দরজাও খুলবে।
নাইট টুরিজম
পর্যটন নিয়েও রয়েছে একাধিক প্রস্তাব। অযোধ্যা পাহাড়, বড়ন্তি, মুরগুমা, খয়রাবেড়া, ঝালদা-সহ জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলিকে নিয়ে প্রস্তাবিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ট্যুরিজম সার্কিট’-এর কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন জ্যোতির্ময়। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে রোপওয়ে, ভিউ পয়েন্ট, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, ইকো-রিসর্ট, ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার, পার্কিং ও স্যানিটেশনের মতো আধুনিক পরিকাঠামো তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। এমনকি ‘নাইট ট্যুরিজম’-এর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন।
কনজ়ারভেশন রিজ়ার্ভ
তবে শুধু পর্যটন নয়, জঙ্গলের বন্যপ্রাণ নিয়েও পৃথক পরিকল্পনার কথা বলেছেন সাংসদ। কোটশিলা-ঝালদা জঙ্গলাঞ্চলে প্রস্তাবিত কনজ়ারভেশন রিজ়ার্ভকে ঘিরে তাঁর দাবি, প্রায় ৪,৩০০-৪,৫০০ হেক্টর এলাকাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে নিয়ন্ত্রিত ইকো-ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করা হোক। তাঁর চিঠিতে চিতাবাঘ, ভাল্লুক, বনরুই, সজারু, মধু-ব্যাজার-সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নেচার ট্রেল, গবেষণা এবং ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টারের মতো পরিকাঠামো তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে।
ফিল্ম সিটি
পুরুলিয়ার পাহাড়-জঙ্গলকে এ বার ‘রুপোলি পর্দায়’ তুলে ধরার প্রস্তাবও দিয়েছেন জ্যোতির্ময়। বান্দোয়ানের কুইলাপালে ফিল্ম সিটি তৈরির দাবি জানিয়েছেন তিনি। স্টুডিয়ো, শ্যুটিংয়ের জায়গা, আবাসন এবং প্রোডাকশন পরিকাঠামো-সহ পরিকল্পিত ফিল্ম সিটি তৈরি হলে টলিউডের পাশাপাশি দেশের অন্য প্রান্তের প্রযোজনা সংস্থাগুলিকেও পুরুলিয়ায় টানা সম্ভব বলে মনে করছেন সাংসদ। তাঁর মতে, তাতে স্থানীয় যুবক ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
আন্তঃরাজ্য বাস টার্মিনাল
চিঠিতে রয়েছে পুরুলিয়া শহরের বহু দিনের দাবি, আধুনিক আন্তঃরাজ্য বাস টার্মিনালও। ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং ওড়িশার সীমানার কাছাকাছি হওয়ায় পুরুলিয়ায় আন্তঃরাজ্য বাসের চাপ রয়েছে। বর্তমান বাসস্ট্যান্ডের পরিকাঠামো সেই চাপ সামলানোর পক্ষে যথেষ্ট নয় বলে দাবি সাংসদের। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী নিতিন গডকড়ীর সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর কথা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন জ্যোতির্ময়। কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ উদ্যোগে বড় মাপের বাস টার্মিনাল তৈরির জন্য কেন্দ্রের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর আর্জি জানিয়েছেন তিনি।
‘পুরুলিয়া-জঙ্গলমহল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’
সব ক’টি প্রকল্পকে এক সুতোয় বেঁধে শেষ পর্যন্ত ‘পুরুলিয়া-জঙ্গলমহল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন সাংসদ। পর্যটন, সড়ক, বিমান যোগাযোগ, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ, আদিবাসী উন্নয়ন, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান—সমস্ত ক্ষেত্রকে পরিকল্পনার আওতায় আনার দাবি তাঁর।
চিঠিতে জ্যোতির্ময়ের বক্তব্য, বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়, সমন্বিত পরিকল্পনায় প্রকল্পগুলির কাজ এগোলে পুরুলিয়ার চেহারাই বদলে যেতে পারে। সেই লক্ষ্যেই সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে সময়ের দাবি মেনে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আর্জি জানিয়েছেন তিনি।