সাধারণ খবর শহর

পুরুলিয়ার ট্রাফিকে বিপদতারিণী 'লক্ষ্মীদি', বিপদতারণ দীনবন্ধু

পুরুলিয়ার অনেক মানুষের কাছে নিরাপদে রাস্তা পার হতে ভরসার নাম 'লক্ষ্মীদি'। আর টোটোর দাপটে যানজটের ভিড়ে থমকে যাওয়া শহরের ছন্দ ফেরানোর আর এক নির্ভরতার নাম দীনবন্ধু।
পুরুলিয়ার ট্রাফিকে বিপদতারিণী 'লক্ষ্মীদি', বিপদতারণ দীনবন্ধু

 

নিজস্ব প্রতিনিধি , পুরুলিয়া :

পুরুলিয়া শহরের ব্যস্ততম মোড়। গাড়ি যত না পার হচ্ছে, তার থেকে বেশি টোটো। কোন সময় যে কার ধাক্কায় হাত পা ভাঙবে, তার নিশ্চয়তা নেই। আর তখনই ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসেন তিনি। পরণে ট্রাফিক পুলিশের কড়া পোশাক। হাতে বরাভয় মুদ্রা। পুরুলিয়ার অনেক মানুষের কাছে নিরাপদে রাস্তা পার হতে  ভরসার নাম 'লক্ষ্মীদি'। আর টোটোর দাপটে যানজটের ভিড়ে থমকে যাওয়া শহরের ছন্দ ফেরানোর আর এক নির্ভরতার নাম দীনবন্ধু।

ট্রাফিক পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর বিজয়লক্ষ্মী রাও এবং এনভিএফ কর্মী দীনবন্ধু মাঝি। দু'জনের পদমর্যাদা আলাদা, দায়িত্বের ক্ষেত্রও কিছুটা ভিন্ন। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের পরিচয় একটাই—বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো মানুষ।

সকাল সাড়ে ন'টা। স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, অফিসগামী মানুষ, বাজারমুখো ভিড়—সব মিলিয়ে হাসপাতাল মোড়, কোর্ট মোড় কিংবা ইউনিয়ন ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় অনবরত গাড়ির স্রোত। সেই ভিড়ের মধ্যেই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকেন কোনও প্রবীণ ব্যক্তি। কখন রাস্তা পার হবেন, বুঝে উঠতে পারেন না। ঠিক তখনই ট্রাফিকের মাঝখান থেকে এগিয়ে আসেন বিজয়লক্ষ্মী রাও। এক হাতে গাড়ি থামান, অন্য হাতে ধরে নিরাপদে রাস্তা পার করিয়ে দেন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাকে। কখনও কোনও শিশুর হাত ধরে, কখনও অসুস্থ মানুষকে এগিয়ে দিয়ে আবার ফিরে যান নিজের জায়গায়। কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার শুরু হয়ে যায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ। পুলিশের পোশাক পরা সেই মহিলা অফিসারকে শহরের বহু মানুষ আর নামে ডাকেন না। তাঁদের কাছে তিনি শুধু 'লক্ষ্মীদি'। পথচারীদের হাসিমুখে সম্ভাষণ, বিপদ দেখলে এগিয়ে যাওয়ার অভ্যাস আর নির্লিপ্ত কর্তব্যবোধই তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে।

বেলগুমার বাসিন্দা বিজয়লক্ষ্মী কনস্টেবল হিসেবে চাকরি শুরু করেছিলেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর হন। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। কিন্তু নিজের কাজের কৃতিত্ব নিয়ে একটি কথাও বলতে চান না। সহকর্মীদের কথায়, "ম্যাডামের কাছে ডিউটি মানেই মানুষের পাশে থাকা।"

শহরের আর এক পরিচিত মুখ দীনবন্ধু মাঝি। বলরামপুরের গেড়ুয়া গ্রামের বাসিন্দা এই তরুণ এনভিএফ কর্মী গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত। বর্তমানে মানভূম ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন ট্রাফিক পোস্টে তাঁর দায়িত্ব।

সকাল আটটা থেকে দুপুর—পুরুলিয়ার সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। চার দিক থেকে ছুটে আসে বাস, ট্রাক, টোটো, মোটরবাইক। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই যেন এক ছন্দে চলতে থাকে দীনবন্ধুর দু'হাত। কখনও ডান হাত থামায়, বাঁ হাত এগিয়ে দেয়, কখনও শরীর ঘুরিয়ে মুহূর্তে খুলে দেন আটকে থাকা রাস্তা। বহু পথচালকের কাছে তিনি শুধু ট্রাফিক পুলিশ নন, ভরসার মানুষ।

সম্প্রতি 'বেস্ট ট্রাফিক পার্সোনেল' হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন দীনবন্ধু। তবে তাঁর সহকর্মীদের মতে, পুরস্কারটি একজনের হাতে উঠলেও তা আসলে প্রতিদিন রোদ, বৃষ্টি আর ধুলোয় দাঁড়িয়ে থাকা গোটা ট্রাফিক বিভাগের কাজেরই স্বীকৃতি।

পুরুলিয়া ট্রাফিক বিভাগের আর এক অভিজ্ঞ মুখ অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর তপনকুমার পান্ডেও একই নিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। শহরের বিভিন্ন মোড়ে তাঁর উপস্থিতিও সাধারণ মানুষের কাছে সমান আস্থার।

ট্রাফিক পুলিশের কাজ সাধারণত নিয়ম ভাঙা আটকানো, যান চলাচল সচল রাখা। কিন্তু পুরুলিয়ার এই কয়েকটি মুখ যেন সেই দায়িত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছেন। শহরের বহু মানুষের কাছে তাঁরা এখন আর শুধু পুলিশ নন—বিপদের সময় হাত বাড়িয়ে দেওয়া পরিচিত মানুষ। তাই অনেকেই মজা করেই বলেন, পুরুলিয়ার রাস্তায় বিপদ এলে আছেন বিপদতারিণী 'লক্ষ্মীদি', আর পাশে বিপদতারণ দীনবন্ধু।